‘সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে আটক হবার পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে মৃত্যু আতংকে। দিন যতই গড়াচ্ছিল ততই এ আশংকাটা আরও বদ্ধমূল হচ্ছিল। ধরেই নিয়েছিলাম, জীবন নিয়ে আর দেশে ফিরতে পারবো না, লাশটাও পৌঁছাবে না স্বজনদের কাছে।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে কেনিয়া থেকে ঢাকায় ফেরার পর আটকাবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে এমনই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন সাত বাংলাদেশি নাবিক। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের তারা বলেছেন, বন্দীদশার সাড়ে তিন বছরের দুঃসহ স্মৃতি আর মুক্তির আনন্দের কথা। কথা বলতে বলতে চোখ মুছেছেন বার বার। ফিরে আসা এই বাংলাদেশি নাবিকরা হলেন সাতক্ষীরার গোলাম মোস্তফা, হাবিবুর রহমান হবি, আবুল কাশেম সরকার, নুরুল হক, চাঁদপুরের লিমন সরকার এবং চট্টগ্রামের আমিনুল ইসলাম ও জাকির হোসাইন।
সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে করে তারা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এ সময় তাদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (মেরিটাইম) রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) খোরশেদ আলম।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরার চার নম্বর সেক্টরের মেরিনো নামের একটি আবাসিক হোটেলে। তারা সেখানেই মিলিত হন স্বজনদের সঙ্গে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বজনরা বুধবার রাতেই ঢাকায় পৌঁছান। আজ শুক্রবার বিকালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন এ সাত নাবিক। জানাবেন বন্দী জীবনের সেই ভয়াবহতার বিস্তারিত।
যেভাবে অপহরণ
নাবিক নুরুল হক বলেন, তাদের এম ভি আলবেদা জাহাজে সাত বাংলাদেশিসহ নাবিক ছিলেন ২৩ জন (বাকিরা পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভারত ও ইরানের)। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পণ্য নিয়ে কেনিয়া যাচ্ছিলেন। ২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর রাত তিনটার দিকে তাদের জাহাজ ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়ে। দস্যুরা সংখ্যায় ছিল ১১ জন। ছোট একটি নৌযানের মাধ্যমে তারা জাহাজের কাছাকাছি গিয়ে গুলি ছুঁড়ে জাহাজ থামাতে বাধ্য করে। জাহাজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা অস্ত্রের মুখে সবাইকে জিম্মি করে এবং বেধড়ক মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জলদস্যুরা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এরপর চলতে থাকে মুক্তিপণ দাবিতে তাদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন। জাহাজ মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেন-দরবারে ব্যর্থ হয় জলদস্যুরা। এরপর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বজনদের শোনাতো নির্যাতনের শব্দ। তাদের একটাই কথা: আমরা মুক্তিপণ চাই (বাংলাদেশি সাত নাবিকের জন্য ৬ লাখ ডলার)। তোদের সরকার ও স্বজনদের জানা, দ্রুত তারা মুক্তিপণ পাঠাক।
নুরুল হক বলেন, এভাবেই দিনগুলো কাটছিল। কখনো কখনো আমাদের দিয়ে অমানবিক পরিশ্রমের কাজ করিয়েছে। আর এত পরিশ্রমের পর সারা দিনে একটি রুটি ও এক লিটার খাবার পানি দিত। মনে হতো কখন হয়তো মরেই যাবো। তিনি আরও বলেন, ঘটনার ছয় মাস পর আমাদের চোখের সামনেই গুলি করে মেরে ফেলা হয় আমাদের সহকর্মী ভারতীয় এক নাগরিককে। তখন ওরা বলছিল মুক্তিপণ না দিলে একে একে সবাইকেই ওই (ভারতীয়) নাবিকের মতো ভাগ্য বরণ করতে হবে। একপর্যায়ে ২০১৩ সালে ৭ জুলাই সকালের দিকে ডুবে যায় আমাদের আলবোদা জাহাজ। এ সময় পানিতে ডুবে মারা যায় আমাদের চার সহকর্মী শ্রীলংকার নাগরিক। পরে আমাদের নিয়ে রাখা হয় জলদস্যুদের ছিনতাইকৃত নাহাম-৩ নামের একটি জাহাজে। এর পর গত ৬ জুন তারা জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পান।
বিমানবন্দরে এ সাত নাবিককে অভ্যর্থনা জানানোর পর নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকদের বলেন, এত দীর্ঘ সময় পর তাদের জীবিত ও অক্ষত উদ্ধার করাটা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমাদের অপহূত সাত নাবিক জীবিত আছেন, এটা জানার পর থেকে তাদের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতায় আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিলাম। এরই ফলে সাতজনকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।’
প্রসঙ্গত, জলদস্যুদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) একটি বিশেষ বিমানে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে নেয়া হয়।
