আজ পবিত্র লাইলাতুল বরাত

আপডেট : ১২ জুন ২০১৪, ২৩:১০
আজ দিনের আলোকরেখা পশ্চিমে মিলিয়ে যাবার পরই শুরু হবে পরম কাঙ্ক্ষিত মহিমাময় রজনী, পবিত্র লাইলাতুল বরাত। শবে বরাত। মহিমান্বিত ভাগ্যরজনী। পাপ থেকে সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে নিষ্কৃতি লাভের অপার সৌভাগ্যের রাত। বর্ণিত আছে যে, সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরক্ষণ থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নূরের তাজাল্লি পৃথিবীর নিকট আসমানে প্রকাশ পায়। তখন আল্লাহপাক বলতে থাকেন-আছে কি কেউ ক্ষমাপ্রার্থী? যাকে আমি ক্ষমা করব? আছে কি কেউ রিজিক প্রার্থী? যাকে আমি রিজিক প্রদান করব? আছে কি কেউ বিপদগ্রস্ত? যাকে আমি বিপদমুক্ত করব? আল্লাহপাকের মহান দরবার থেকে প্রদত্ত এ আহ্বান অব্যাহত থাকে ফজর অবধি। বস্তুত শবে বরাত হলো আল্লাহপাকের মহান দরবারে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সময়। আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের এক দুর্লভ সুযোগ এনে দেয় এ রাত। এ রজনীর গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, পরবর্তী বছরের হায়াত, মউত, রিজিক, দৌলত, আমল প্রভৃতি যাবতীয় আদেশ-নিষেধ এ রাতেই ফয়সালা করা হয়। অতএব, প্রতিটি কল্যাণকামী মানুষের প্রধানতম কর্তব্য হলো এ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে পূর্ণ রাত অতিবাহিত করা। তাত্পর্যপূর্ণ এই রাতে বিশেষ বরকত হাসিলের মানসে মুসলিম সম্প্রদায় রাত জেগে নফল নামাজ আদায় ও কোরআন তেলাওয়াত, ইবাদত-বন্দেগি, ইস্তেগফার, জিকির-আসকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়ায় মশগুল থাকেন। ‘লাইলাতু’ একটি আরবী শব্দ, আর ‘শব’ শব্দটি ফারসী। দুইটি শব্দের অর্থই হলো রাত। অপরপক্ষে বারাআত শব্দের অর্থ হলো- নাজাত, নিষ্কৃতি বা মুক্তি। এ রাতে বান্দারা মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে মার্জনা লাভ করে থাকেন। এ কারণে এ রাতকে ‘লাইলাতুল বারাআত’ বা শবে বরাত বলা হয়। শাবান মাসের মধ্যর্তী রাতে পবিত্র শবে বরাত পালিত হয়। এ ব্যাপারে কুরআন শরীফে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও হাদীস শরীফে এটাকে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা মধ্য শাবানের রাত্রি নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর পক্ষকাল পরেই আসবে রহমত বরকত নাজাতের মাহে রমজান। এ কারণে এটাকে বলা হয় রমজানের মুয়াজ্জিন। লাইলাতুল বারাআত মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, ইরান ও ভারতীয় উপমহাদেশে এ মাসের একটি রজনীকে ‘শব-ই-বরাত’ বলা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন কোন দেশের কোন কোন এলাকায় শবে বরাত ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। আরববাসীরা এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন। মুআয ইবনে জাবাল (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা এই রাতে সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। আটজন সাহাবীর সূত্রে বিভিন্ন সনদে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। শবে বরাত বিষয়ে এটিই একমাত্র সহীহ হাদীস বলে মুহাদ্দিসগণ মনে করেন। তবে ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো শিরক ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা। এ রাতে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে নফল নামাজ পড়া, যাতে সেজদাও দীর্ঘ হবে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এটাই কাম্য। নফল নামাজের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দুই রাকাত করে যত রাকাত সম্ভব হয় পড়তে থাকা। নিজের জন্য, নিজের পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি,আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী ও সব মুসলমানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। সম্ভব হলে পুরুষের জন্য কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত করা, কবরবাসীদের জন্য দোয়া করাও সওয়াবের কাজ। এ রাতের নফল আমলসমূহ বিশুদ্ধ মতানুসারে একাকীভাবে করণীয়। ফরয নামাজ জামায়াতের সঙ্গে অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। তবে নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোন প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই আর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন-তাবে তাবেঈনদের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। তবে এমনিই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যায়, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলের ব্যাঘাত সৃষ্টি করবেন না। এই রাতেই পরবর্তী বছর মৃত্যুবরণকারী মানুষ এবং পরবর্তী বছর জন্মগ্রহণকারী শিশুদের তালিকা করা হয়। এই রাতে শুদ্ধ মনে তওবা করার পর নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে এবং ইসলামী বিধান মেনে চলতে হবে। আর এ রাতে হালুয়া-রুটি, ফিন্নী-পায়েশ, খিচুড়ি, বিরিয়ানি প্রভৃতি বিতরণ বাধ্যতামূলক নয়। আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটি আর আতশবাজির মেলা এ রাতের পবিত্রতায় আঘাত হানে। কারণ উত্সব নয়, কেবল প্রার্থনার রাত শবে বরাত। যথাযথ মর্যাদায় ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে আজ পবিত্র শবে বরাত উদযাপিত হবে। এ উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আজকারের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা এবং মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আজ রাতভর ওয়াজ মাহফিল, জিকির-আজকারের ব্যবস্থা করেছে। বাদ এশা থেকে বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরামগণ ওয়াজ করবেন। ফজরের নামাজ শেষে ভোরে মোনাজাত পরিচালনা করা হবে। শবে বরাত উপলক্ষে কাল সরকারি ছুটি। এ রাতের তাত্পর্য তুলে ধরে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্র প্রকাশ করবে বিশেষ ক্রোড়পত্র। এই উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণীতে পবিত্র শবে বরাতের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবার প্রতি মানব কল্যাণে ও দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।