তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তির কোনো কারণ নেই। গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি জনগণ মেনে নেবে না। বর্তমান সমস্যার সমাধান না হলে, দেশে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে তা আজ হবে, না কাল হবে জানি না।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি:কিছু ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আকবর আলী খান বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এখন দেশে একটি গ্রহণ যোগ্য নির্বাচন কিভাবে হবে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে এবং সে পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে। তবে দেশে আরেকটি নির্বাচন হলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তার নিশ্চয়তা নেই। এ জন্য শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণও দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতা নিয়ে হালুয়া-রূটির ভাগাভাগি চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ জন্য ভাল মানুষেরা রাজনীতিতে আসছেন না। অথচ রাজনীতিতে ভাল মানুষদের আসা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে দেশ আরো ভয়াবহ দিকে এগিয়ে যাবে।
আলোচনা সভায় লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশের শাসনব্যবস্থায় নাকি সরকার অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে। এই ‘সরকার অব্যাহত রাখার’ কথাটি উদ্বেগজনক। তবে দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য যেসব নীতি সুফল বয়ে আনে, তার ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজন আছে। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবেন তাঁরা কোনো সরকারকে অব্যাহত রাখবেন, না পরিবর্তন করবেন।
বিশিষ্ট এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকের প্রতিনিধি পছন্দ করার অধিকার ও কর্তৃত্ব। তিনি বলেন, ‘দশম সংসদ নির্বাচনের পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আরেকটি সংসদ নির্বাচন। এমন একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করাটা সরকারের প্রতিনিধিত্বমূলক স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজন। এ সমস্যা গণতন্ত্রের যাত্রাকে প্রতিনিয়ত বিচ্যুত করছে।
অনুষ্ঠানে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না বলে মন্তব্য করে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার অবিলম্বে সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচন মানে হলো চয়েজ। যেখানে একাধিক প্রার্থী থাকবে এবং ভোটাররা একাধিক প্রার্থীর মধ্য থেকে তাদের প্রতিনিধি ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে বাছাই করবে। চলমান সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হলে দেশ অস্থিরতার দিকে এগিয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, নির্বাচন নিয়ে জনগণকে ফাঁকি দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। জাতি দীর্ঘদিন ভ্রান্তির মধ্যে থাকবে না। ক্ষমতার অতি লোভ, দম্ভ, দুর্নীতি সন্ত্রাসের কারণে দেশ আজ অকার্যকর হওয়ার পথে। আর সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র একেবারেই দুর্বল মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাষট্টির পর থেকে এদেশে যে কত ধরণের গণতন্ত্র দেখেছি তার হিসেব নেই। গণতন্ত্র যে কি জিনিস আজও বুঝতে পারলাম না। বর্তমানে আমাদের দেশে সকল শ্রেণি পেশার লোকেরা নিজেদের স্বার্থে গণতন্ত্রের উপর চড়াও হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে গণতন্ত্রকে ব্যবহার করছে। নিজেদের ক্ষমতায়নের স্বার্থে তৃণমূল পর্যায়ে দুর্বৃত্তদের দিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সাবেক সংসদ সদস্য হুমায়ুন কবির প্রমুখ।
