গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৪, ১৯:৪৬
মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট জড়তা পর্ব— ১০ আজকে মর্নিংওয়াক সেরে বাসায় ঢুকেই বিন্দু বললো— পানি দাও মা। মা বললেন— জগ গ্ল¬¬াস আছে, খেয়ে নে। না, তুমি দাও। বললো বিন্দু। কমলা ধমক দিলেন— একটা কাজ নিজে করবি না। পানিটাও আমাকে দিতে হবে। একেবারে জড় পদার্থ হয়ে গিয়েছিস। নীলকান্তবাবু হাসলেন, আচ্ছা আমি দিচ্ছি। বলে তিনি গ্ল¬াসে পানি ঢেলে একেবারে নিজের হাতে খাইয়েই দিলেন। বললেন— আরেকটু বড় হয়ে নে, তাহলে নিজেই নিজের কাজ করতে পারবি। না না, তুমি ওকে কোনো কাজ শিখতে দিচ্ছো না। ওর জড়তা কাটবে কীভাবে ? স্বামীকেও ধমক লাগালেন কমলা। কিন্তু জড়তা তো প্রত্যেক বস্তুর ধর্ম —নীলকান্তবাবু বললেন। রাখো তোমার ধর্ম— কমলা আরো চটলেন। সব কথাতেই ফিজিক্স। জড়তা বস্তুর ধর্ম হতে পারে, মানুষের কাজ নয়। বিন্দু তার পক্ষে বাবাকে পেয়ে খুশি। সে প্রসঙ্গ বদলানোর সুযোগ খুঁজতে গিয়ে বললো— জড়তা কী বাবা ? নীলকান্তবাবু বললেন— কোনো বস্তু যেভাবে আছে, ঠিক সেইভাবে থাকতে চাওয়ার ইচ্ছাই হলো জড়তা। মানে হলো বস্তু স্থির রাখা হলে স্থিরই থাকতে চাইবে, আর গতিশীল হলে গতিশীলই থাকতে চাইবে। সেটা তো সবাই জানে —বললো কমলা। সবাই জানে ? হ্যাঁ। তুমি মর্নিংওয়াকে যাবার আগে ঘড়িটা বারান্দায় রেখে গিয়েছিলে। ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাইতো। মনে পড়লো নীলকান্তবাবুর। তিনি ঘড়ি হাতে নিয়েও রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভিতরে রাখতে ভুলে গিয়েছিলেন। কমলা বললেন— এটি আমি এনে রাখলাম। নইলে তো সেখানেই পড়ে থাকতো। ঠিক বলেছো —বললেন নীলকান্তবাবু। ঘড়িটা কেউ না সরালে সেখানেই থেকে যেতো। এর নাম জড়তা, এটি হলো স্থিতিজড়তা। কণিকা বললো— চোরেও তো নিতে পারতো। তা পারতো, কিন্তু কথা হলো কেউ না কেউ একে সরাতে হতো। কিন্তু গতিশীল বস্তু কীভাবে গতিশীল থাকতে চায় ? বললো আকাশ। নীলকান্তবাবু বললেন— গতিশীল বস্তুকে যদি কেউ বাধা না দেয়, অথবা তার গতির বিপরীতে বল প্রয়োগ না করে, তাহলে এটি সবসময় গতিশীল থাকবে। হ্যাঁ, তুমি যাওয়ার সময় ড্রইংরুমের ফ্যানও বন্ধ করে যাওনি —বললেন কমলা। আমি বন্ধ না করলে তো এটি চলতেই থাকতো। তাই নাকি ? তুমি ঠিক বলছো ? ফ্যান বন্ধ করে যাইনি ? — নীলকান্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন। আবার জিজ্ঞেস করছো— বললেন কমলা। আজকে তাঁর মেজাজ চড়া। স্যরি কমলা, আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম। আকাশ বললো— মামা, আর ভুল করো না, মামি বকা দিবে। কমলা হাসলেন। বললেন— তোমার মামাকে বকে লাভ নেই। আকাশ বললো— লাভ নেই তাহলে বকো কেন ? আর বকবো না —বললেন কমলা। অণু বাথরুমে ঢুকেছিলো মর্নিংওয়াক থেকে এসে। সে এইসব বকাবকির মধ্যে ছিলো না। বের হয়ে এসে তোয়ালে খুঁজতে লাগলো। সীমা এনে দিলো তোয়ালে। একবার ঝেড়ে নিয়ে হাত পা মুছতে লাগলো অণু। নীলকান্তবাবু বললেন— বল তো অণু তোয়ালেটা ঝাড়লো কেন ? কেন আবার, ধুলাবালি থাকলে পড়ে যাবে। বললো সীমা। কিন্তু পড়বে কেন ? নীলকান্তবাবু জিজ্ঞেস করলেন। সীমা চুপ করে থাকলো, ঝাড়লে ধুলাবালি পড়বে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না। নীলকান্তবাবু বললেন— এটিও স্থিতিজড়তার কারণে। ঝাড়া দেবার মানে হলো টাওয়েলটাকে হঠাত্ সরিয়ে নেয়া। তোয়ালে তো হঠাত্ সরিয়ে নিলে, কিন্তু ধুলিকণা ঐ জায়গায় থাকতে চাইলো। ফলে এটি বাতাসে ভেসে গেলো, তুইও ধুলিমুক্ত তোয়ালে ব্যবহার করতে পারলি। নীলকান্তবাবুও পানি ঢেলে খেলেন একগ্ল¬¬াস। বললেন— স্থিতিজড়তার দরুন বড়বড় বিল্ডিং ভেঙ্গে পড়ে যায়। কীভাবে ? আকাশ বললো। ভূমিকম্পে যখন মাটি কাঁপতে থাকে, তখন মাটির সাথে বিল্ডিংএর নিচের অংশও ডানে বামে দোলে। কিন্তু পিলারের উপরের অংশ তো তার জায়গায় থাকতে চায়। কাজেই এটি ভেঙ্গে পড়ে। কমলা ইতোমধ্যে চা রেডি করে আনলেন। চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে সবার হাতে একটা প্লে¬ট ধরিয়ে দিয়ে তিনি বললেন— গতিশীল বস্তু কীভাবে গতিশীল থাকতে চায় সেটি বলো। তাঁর মেজাজ এখন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। নীলকান্তবাবু বললেন— এই যে তুমি চামচ দিয়ে চা নাড়ছো, চা তো কাপে ঘুরতে থাকলো। তুমি যখনই চামচটা তুলে ফেললে, চা কি ঘুরা বন্ধ করে দিলো ? সবাই তাকালো চায়ের কাপে। সীমা বললো, না তো, চা তো এখনো ঘুরছে। এটিই গতিজড়তা। গতিশীল চা গতিশীলই থাকতে চায়। —বললেন নীলকান্তবাবু। কিন্তু চা তো একটু পরই থেমে যাবে। বললেন কমলা। নীলকান্তবাবু বললেন— থেমে যাবে কাপের সাথে চা এর ঘর্ষণের কারণে। ঘর্ষণে কাপ চা এর ওপর একটা বিপরীতমুখী বল প্রয়োগ করে। এতে করে কাপের মধ্যে চায়ের ঘূর্ণন বন্ধ হয়ে যায়। আরো আছে। চন্দ্রাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোরা বলছিলি কক্সবাজার থেকে আসার সময় ড্রাইভার খুব স্পিডে বাস চালাচ্ছিলো। হ্যাঁ-মামা, চন্দ্রা বললো। একবার হঠাত্ ব্রেক ধরায় আমি তো হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলাম। সামনের সিটের সাথে ধাক্কা লেগে গেলে তো নাক ভেঙ্গে যেতো। বিন্দু হাসলো— তখন সবাই তোমাকে নাককাটা বলতো। অণুও হাসলো। নীলকান্তবাবু বললেন— ব্রেক ধরায় তুই সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লি যে কারণে, সেটিও গতিজড়তা। কীভাবে মামা ? আকাশের প্রশ্ন। যখন বাস চলন্ত অবস্থায় ছিলো, তখন সিটের সাথে তোর শরীরের নিচের অংশ যুক্ত ছিলো। যার ফলে ব্রেক ধরার সাথে সাথে নিচের অংশও থেমে গিয়েছিলো। কিন্তু উপরের অংশ তো সরাসরি বাসের সাথে যুক্ত নয়। ফলে ব্রেক ধরার পরও উপরের অংশ বাসের সমান বেগ নিয়ে সামনের দিকে যেতে চাইলো, আর তখনই তুই হুমড়ি খেয়ে পড়লি। গতিজড়তা না থাকলে ব্রেক ধরলে তুই হুমড়ি খেয়ে পড়তি না। তোদের স্কুলে খেলা হয় না? বর্শা নিক্ষেপ ? তখন দেখবি সবাই দৌড়ে এসে বর্শা নিক্ষেপ করছে। এটিও গতিজড়তার কারণে। দৌড়ে এসে নিক্ষেপ করলে বর্শা বেশি দূর যাবে। তাহলে দুই ধরনের জড়তা আছে, তাই না মামা ? বললো আকাশ, গতিজড়তা, আর স্থিতিজড়তা। ঠিক তাই —বললেন নীলকান্তবাবু। কমলা বললেন— তাহলে এবার তোমরা উঠে পড়ো, তোমরা তো বস্তু নও যে স্থিতিজড়তায় পেয়ে বসেছে।