দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সঙ্গে বাজেট সঙ্গতিপূর্ণ নয়

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৪, ২২:৪২
প্রস্তাবিত বাজেটকে অনেকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বললেও এর লক্ষ্যমাত্রাগুলো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে রয়েছে বাজেটের লক্ষ্যগুলো। ভিশন-২০২১ বা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রয়েছে অনেক দূরে। আসছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সিপিডির পর্যালোচনায় এমন মন্তব্য করলেন বক্তারা। সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, পরিকল্পনা আর বাজেট এক বিষয় নয়। পরিকল্পনা কিংবা অভিলাসকে দেশপ্রেমের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি এমন যে, মনে করা হচ্ছে যিনি যত বড় বাজেট দিতে পারবেন তিনি তত বেশি দেশপ্রেমিক। অভিলাস থাকা কাম্য কিন্তু যেখানে যেটা থাকা উচিত সেখানে সেটা থাকা দরকার। বাজেট আর পরিকল্পনা এক নয়। এর জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেছেন, কাউকে ঠকানোর জন্য কিংবা ভ্রান্তিতে ফেলার জন্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়নি। বাজেটে কাউকে উপেক্ষাও করা হয়নি। বাজেটকে উচ্চাবিলাষী বলা হয়েছে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক খোরাক। এজন্য কম বা বেশি দিলে হবে না। আমাদের অর্থনীতি যে পরিমাণ নিতে পারবে তাই দিতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের চাহিদা ছিল ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করা, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। প্রেক্ষিত পরিকল্পনার প্রতিটি বিষয়ই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। এসব কারণে এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডি’র ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। এছাড়া বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে ড. দেবপ্রিয় ইতিপূর্বে ‘লক্ষ্য বিলাসী’ মন্তব্য করায়, সরকারি নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই এর সমালোচনা করেন। বাজেটের লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী এবং ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন মন্তব্যও করেন তিনি। গতকাল বাজেট ও সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, বাজেটের আইনি ভিত্তি থাকলেও পরিকল্পনার কোনো আইনি ভিত্তি নেই তাই পরিকল্পনাকে সংসদে পাস করতে হয় না। বাজেট তৈরি হয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে। এখানে অভিলাস কাম্য নয়। তবে কেউ কেউ অভিলাসের জায়গাকে রূপকল্পের (পরিকল্পনা) সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। বাজেটের ভীত শক্তিশালী না হলে বাজার একটি মিশ্র সংকেত পাবে। উন্নয়ন প্রশাসন এতে গা লাগাবে না, বিদেশিরা একে গ্রহণ করবে না। সময়মতো বাজেট বাস্তবায়িত না হলে জনগণ তখন হতাশ হবে। পরিকল্পনাতে অভিলাস থাকা দোষণীয় ব্যাপার নয়। পরিকল্পনা আর বাস্তবভিত্তিক বাজেট না হওয়ায় গত তিন অর্থবছরের বাজেটের অর্থায়নের সঙ্গে যে প্রাক্কলন করা হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সরকারের পরিকল্পনাগুলো যথার্থ এমন দাবি করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা আদায় করা সম্ভব। কারণ আমাদের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বেড়েছে। প্রতিবছর দেশে ১ দশমিক ৭ ভাগ হারে দারিদ্র্য কমছে। এভাবে কমতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারবো। তিনি বলেন, অনেকেই ইতিহাস মনে রাখে না, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের অর্থনীতির আকার কি ছিলো আর এখন কি হয়েছে। তিনি বিভিন্ন খাতে অর্জনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত বিশ্বের কাতারে চলে আসবে। অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, যারা বলেন এ বাজেট ভ্রান্তি বিলাস, তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। আমরা ইতিপূর্বে ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি এবারও পারবো। তিনি বলেন, এবারের বাজেট হয়েছে বিনিয়োগ বান্ধব। এ বাজেটে কর অবকাশ, প্রণোদনাসহ বিনিয়োগ আকর্ষণে বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা অবশ্যই বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো। তিনি আরও বলেন, আমরা দেশে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়িয়েছি। খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। এছাড়া দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য ড্রেজিং করছি, যা আগে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আসছে বাজেটে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি, ব্যালেন্স অব পেমেন্টে চাপ থাকবে। তাছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করারও চাপ থাকবে। ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন খুবই কঠিন। বড় প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নসহ সরকারি পরিবীক্ষণ সংস্থা আইএমইডিকে পুনর্গঠন করার আহ্বান জানান তিনি। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি যথাযথভাবে অর্জিত হয়নি, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা অনেক দূরের বিষয়। জেলা বাজেট ‘আই ওয়াশ’ উল্লেখ করে ‘লোকাল গভমেন্ট ফাইন্যান্স কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি। সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য পুন:অর্থায়ন তহবিল গঠনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য পুনঅর্থায়ন হলো অপচয়। তাদের পুনঅর্থায়নের চেয়ে খেলাপী ঋণ আদায়ে কার্যকর করতে হবে। ড. আকবর আলী খান বলেন, সংসদে কার্যকর বিরোধী দল নেই। জাতীয় সংসদ যদি কার্যকর বিরোধীদলের মাধ্যমে গঠিত হতো তাহলে বাজেট নিয়ে অর্থবহ আলোচনা হতো। অন্যান্য দেশে বাজেট পেশ করার আগে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হলেও আমাদের দেশে এ সুযোগ নেই। আমরা কোথায় যাচ্ছি তার কোন নির্দেশনা বাজেটে নেই। কর কমানো কিংবা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রস্তাব বাজেটে থাকলেও এর ফলে কোন খাতে কত টাকা রাজস্ব আদায় কমবে কিংবা নতুন কর কী প্রভাব ফেলবে তার নির্দেশনা নেই। দেশের অধিকাংশ দরিদ্র্য এমন সীমায় রয়েছে যে, পণ্যের দাম বেড়ে গেলে অনেকেই আবার সে সীমার নিচে চলে যাবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠান করতে হবে। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে জিডিপি’র ১৮ শতাংশ বাজেট মোটেই বড় আকারের নয়। তিনি বলেন, এবারের বাজেট হলো জনকল্যাণমুখী এবং দরিদ্র্যবান্ধব। এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের দাবী প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু নারীদের জন্য বরাদ্দ দিলে হবে না, তাদের গ্রামীণ উন্নয়নের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ার বাজারে লিস্টেড ও নন লিস্টেড কোম্পানির মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ইএবি প্রেসিডেন্ট আব্দুস সালাম মুর্শেদী বলেন, রপ্তানিকারকদের জন্য একটি স্থির ডলারের দাম নির্ধারণ করে দেয়া প্রয়োজন। সরকারি চারটি ব্যাংক নিয়ে যে অবিশ্বাস চলছে তাতে ব্যবসায়ীক খরচ আরো বেড়ে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন তাজুল ইসলাম এমপি, ব্র্যাকের ড. মাহবুব হোসেন, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট মীর নাসির, অধ্যাপক আবু আহমেদ, সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল আহমেদ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আব্দুল মান্নান হাওলাদার, নারী উদ্যোক্তা প্রীতি চক্রবর্তী বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।