‘সূর্যসেন’ নামটি এমন কেউ নেই যে, জানে না। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য জীবন উত্সর্গকারী একটি নাম। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক চট্টগ্রামের বীর সন্তান সূর্যসেন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে প্রাণ দিয়েও স্বাধীনতার জয়গান গেয়েছেন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অস্ত্রাগার লুণ্ঠন সশস্ত্র সংগ্রামী সূর্যসেনের বুদ্ধি ও পরামর্শেই সম্ভব হয়েছিল। তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দুঃসাহসী অভিযান, নেতৃত্ব দেশের যুবশক্তিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উজ্জীবিত করেছিল। চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানাধীন নোয়াপাড়া গ্রামে ১৮৯৪ সালের ২২ মে জন্মগ্রহণ করেন এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীর সন্তান। তাঁ বাবা রাজমণি সেন ও মা শশীবালা। সূর্যসেনরা ছিলেন চার বোন ও দুই ভাই। মাত্র চার বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। কাকা গৌরমণি সেনের স্নেহে তিনি মানুষ হন। ১৯১৭ সালে তিনি বি. এ পাস করেন।কিশোর বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজরা এ দেশের শত্রু। শত্রুর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য সে সময় থেকেই ভাবতে থাকেন। কলেজে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী সংগ্রামে যোগ দেন। তাঁকে আরো বেশি করে স্বদেশী চিন্তায় অনুপ্রাণিত করেছিল — ক্ষুদিরামের ফাঁসি। সে সময় চট্টগ্রামে একটি গোপন বিপ্লবী দল ছিল। সূর্যসেন এ দলেই যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর দূরদর্শিতা, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে দলের একজন নেতা হয়ে ওঠেন। তরুণদের মধ্যে বিপ্লবের মন্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি শিক্ষকতার চাকরি নেন। তিনি দেশপ্রেমের শিখা জ্বালাতে শুরু করেন যুব সমাজের অন্তরে। জনপ্রিয় এই শিক্ষককে ছাত্ররা একসময় ‘ মাস্টার দা’ বলে ডাকতে শুরু করে। এই ডাক তিনি খুব পছন্দ করতেন।
স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে। জেলে থাকার সময় তাঁর স্ত্রী হঠাত্ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সূর্যসেনের নেতৃত্বে মাত্র কয়েকজন যুবক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল এবং ধ্বংস করে ফেলেন। সেই রাতেই সূর্যসেন ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম দুশো বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত।
১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক বিশ্বাসঘাতক ও অর্থলোভী বুড়ির কাছ থেকে খবর পেয়ে সূর্যসেনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। বিচারে তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। স্বাধীনতার গান গাইতে গাইতে মাস্টার দা সূর্যসেন আত্মোত্সর্গ করেন । তিনি বিপ্লবের এক মহান আদর্শ।
