কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন এবং তার দুই সহযোগী সেলিম ও সুমন খানকে ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল রবিবার শুনানি শেষে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের দ্বিতীয় বিচারিক হাকিম এডউইন লেপচা এ আদেশ দিয়েছেন।
এদিকে নূর হোসেন গ্রেফতারের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় খুব শিগগিরই নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনতে কতদিন সময় লাগতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিগগিরই জানতে পারবেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, নূর হোসেনকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতিমধ্যে কলকাতার স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত কার্যক্রম অনেকটাই এগিয়েছে।
কলকাতা প্রতিনিধি তারিক হাসান জানান, নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে বিধাননগর কমিশনারেটের বাগুইহাটি থানায় মামলা হয়েছে। এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে দুইটার দিকে দশ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে হাজির করে। এর আগে আদালত হাসপাতালে নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। শুনানি শেষে আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে নূর হোসেন ও তার সহযোগীদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে দাঁড়াননি।
আদালতে উপস্থাপিত পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়, নূর হোসেনের আরও কোনো সহযোগী পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই তাদের রিমান্ডে নেয়া দরকার।
পুলিশ জানায়, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নূর হোসেন জানিয়েছেন, তিনি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।
গত শনিবার রাতে বিধাননগর কমিশনারেটের অ্যান্টি টেরোরিজম স্কোয়াডের (এটিএস) এসিপি অনিমেষ সরকারের নেতৃত্বে একটি টিম কলকাতার নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী বাগুইহাটির কৈখালী এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে। পুলিশ এসময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে বাংলাদেশ ও ভারতের ৪টি মোবাইল, কয়েকটি সিম কার্ড, একটি ল্যাপটপ, কিছু কাগজপত্র এবং ২ হাজার টাকা। পুলিশ ফ্ল্যাটের মালিক সীমা সিংকে খুঁজছে। তবে নূর হোসেন জানিয়েছেন, এক দালাল মারফত ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল।
পুলিশ জানায়, বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্য মতে নূর হোসেনকে গ্রেফতারে কলকাতা পুলিশ ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন প্রাপ্ত তথ্যে পুলিশ নিশ্চিত হয় নূর হোসেন কৈখালী এলাকাতেই অবস্থান করছেন। তবে নূর হোসেন বারবার মোবাইল ফোনের সিম বদলিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যায়ে কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার প্ল্যানও করেছিলেন। ইচ্ছে ছিল সিমলায় গিয়ে কিছুদিন লুকিয়ে থাকা। কলকাতায় কাদের সাহায্য নিয়ে নূর লুকিয়েছিলেন জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও নূরের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছে।
জেরায় নূরের কাছ থেকে জানার চেষ্টা হবে বাংলাদেশে তিনি কী কী অপরাধ করেছেন। কলকাতায় কোনো অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত কি না, কিংবা আন্তর্জাতিক মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে তার যোগ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।।
নূর হোসেনকে ফেরত আনার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নূর হোসেনকে দেশে ফেরত আনার দাবিতে গতকাল সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। পাশাপাশি একই দাবি জানানো হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নিহত পরিবারগুলোর সদস্যদের পক্ষ থেকে।
নূর হোসেন গ্রেফতারের ব্যাপারে নিহত নজরুল ইসলামের ভাই আব্দুস সালাম বলেন, মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে গ্রেফতার করায় আমি খুশি। কারণ আমরা বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে বিচার করুন। তাহলেই আমরা ভুক্তভোগী পরিবারগুলো শান্তি পাবো। আর নারায়ণগঞ্জবাসী সন্ত্রাসীদের কবল থেকে মুক্তি পাবে।
নূর হোসনকে আনার প্রক্রিয়া
পুলিশ সদর দফতরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দীবিনিময় চুক্তি রয়েছে। ফলে নূর হোসেনকে আনার ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে সবকিছু একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে চলবে। এজন্য হয়তো কিছুটা সময় লাগতেও পারে। তিনি বলেন, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র তৈরি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতে পাঠাবে। পরে যাচাই-বাছাইয়ের পরই নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। তবে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ভারতে মামলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আদালতের বিষয়টিও রয়েছে।
