‘তাঁর মানবিকতার সাধনা ব্যর্থ হবার নয়’

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৪, ২২:৪১
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন মানুষের মুক্তির জন্য উত্সর্গকৃত প্রাণ সরদার ফজলুল করিম। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্ল¬বী, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমকে গতকাল রবিবার বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা করিমের কবরে দাফন করা হয়েছে। এর আগে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একাডেমির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘সরদার ফজলুল করিম জীবনের প্রায় পুরোটা সময় বাংলায় জ্ঞানচর্চা ও সাধারণ মানুষের মুক্তিসাধনা-এই দুই মহতিকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তার মানবিকতার এই সাধনা ব্যর্থ হবার নয়।’ সরদার ফজলুল করিম গত শনিবার রাত পৌনে একটার দিকে রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্ল¬াহে ... রাজেউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তিনি এক কন্যা, ২ ছেলে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের মরদেহ গতকাল সকালে তার ধানমন্ডির বাসভবনে নেয়া হয়। সেখানে তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় কোরআনখানি হয়। তাকে এক নজর দেখতে আত্মীয়-স্বজনরা ভিড় জমান। বেলা ১১টার দিকে পুরানা পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ে মরদেহটি আনা হয়। এসময় সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নেতার মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। সেখানে শ্রদ্ধা জানান সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, দলের নেতা মঞ্জুরুল আহসান খান, অধ্যাপক এম এম আকাশ প্রমুখ। এরপর সিপিবি কার্যালয় থেকে মরদেহ তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সর্বস্তরের নাগরিকদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একাডেমির নজরুল মঞ্চের সামনে মরদেহটি রাখা হয়। বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের নেতৃত্বে একাডেমির কর্মকর্তা— কর্মচারীরা তাদের এককালের প্রিয় সহকর্মী সরদার ফজলুল করিমের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় ভাষাসংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও ড. আনিসুজ্জামান, সন্জীদা খাতুন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন, ভারতের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক গৌতম ভদ্র, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, অজয় রায়, নূরজাহান বোস, মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, ডা. সারওয়ার আলী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, স্থপতি ইকবাল হাবিবসহ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ সরদার ফজলুল করিমের মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল ও প্রধানমন্ত্রীর পিএস আব্দুল মালেক মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে বাংলা একাডেমি থেকে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মরদেহ আনা হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ, উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পুষ্পস্তবক দিয়ে প্রয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আট দিন আগে অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছিল। হাসপাতাল সূত্র জানায়, তিনি হূদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরে ভুগছিলেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক: রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া ও চীফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রনজিত্ কুমার বিশ্বাস অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের মৃত্যুতে পৃথক বিবৃতিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে তারা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। জেপি’র শোক: জাতীয় পার্টি-জেপি’র মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক প্রকাশ করে গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, সরদার ফজলুল করিম ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল চিন্তার ধারক, তার মৃতুতে দেশ একজন বলিষ্ঠ দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্বকে হারালো। এছাড়া তাঁর প্রতি শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, রণেশ দাশগুপ্ত চলচ্চিত্র সংসদ প্রভৃতি দল ও সংগঠন। সংক্ষিপ্ত জীবনী:সরদার ফজলুল করিম ১৯২৫ সালের মে মাসে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার আটিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় এসে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে বিএ অনার্স ও এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে তিনি রাজনীতির কারণে স্বেচ্ছায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ইস্তফা দেন। ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির অনুবাদ শাখায় যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে তিনি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যান। সরদার ফজলুল করিম বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর রচিত ও অনূদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে প্লে¬টোর সংলাপ, প্লে¬টোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট, পাঠপ্রসঙ্গ, চল্লি¬শের দশকের ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ, সেই সে কাল, কিছু স্মৃতি কিছু কথা, নানা কথা, নানা কথার পরের কথা ইত্যাদি। এছাড়া ‘দর্শনকোষ’ নামে দর্শনের একটি অভিধান লিখেছেন তিনি।