রাজধানীর পল্লবীর বিহারী ক্যাম্পে ১০ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুনিদের শাস্তির দাবিতে কালশি রোডের মিল্লাত ক্যাম্পের সামনে মিছিলরত বিহারীরা ফের উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। সেখানে তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এক পর্যায়ে গতকাল রবিবার বিকেলে দু‘টি যাত্রীবাহী বাসে ভাঙচুর চালিয়েছে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য পুলিশী সহযোগিতায় এমপি ইলিয়াস মোল্লার লোকজন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ এনেছেন বিহারীরা। তারা এমপির ‘ফাঁসি’র দাবি করেছেন। তারা এমপির কুশপুত্তলিকা দাহ করে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ও বিহারীরা পৃথকভাবে ৬টি মামলা করেছে। মামলা ৬টিতে ৩২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৩ হাজার ২৫২ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবগুলো মামলাই গতকাল সন্ধ্যায় ডিবিতে স্থানাস্তর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। গতকাল তাদের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বিকাল পৌনে ৫টার দিকে খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে উত্তেজিত বিহারীরা জাবালে নূর ও ই টি সি পরিবহনের দু‘টি যাত্রীবাহী বাসে ভাঙচুর চালায়। তবে এ ঘটনায় বাসের যাত্রীরা দ্রুত নেমে যাওয়াতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওই এলাকায় বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে। উত্তেজিত বিহারীরা ১০টি লাশ হাসপাতাল থেকে ক্যাম্পে নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি ও সান্ত্বনা কামনা করেন।
গতকাল সকাল থেকেই বিহারীরা মাথায় কালো ও সাদা কাপড় বেঁধে মিছিল শুরু করেন। দুপুর পৌনে একটা থেকে লোক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিল বড় হতে থাকে। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে বিপুল পরিমাণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মিছিলে বিহারী নেতা স্টান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির সভাপতি নিজামুদ্দিন বলেন, ‘লাশগুলো আনার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের ক্যাম্পে এসে আমাদের দুঃখের কথা শুনতে না আসেন, স্থানীয় এমপি আমাদের উপর কি অত্যাচার শুরু করেছেন তা জানতে না আসেন তাহলে আমরা লাশগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করবো।’ কমিটির প্রচার সম্পাদক খোরশেদ আলম বলেন, ‘আগুনে পুড়িয়ে আমাদের ক্যাম্পের লোকদের হত্যার দায়ে প্রকৃত দোষীদের যথাযথ বিচার করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে হবে।’ গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই কালশি রোডে বিহারীরা জড়ো হচ্ছেন। তবে আগে থেকেই জলকামানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে পুলিশও প্রস্তুত ছিল। বিহারীরা অভিযোগ করেন, ইয়াছিন, বাবুল ও আশিকসহ তাদের ১২/১৩ জনকে সংঘর্ষের পর থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের কয়েকজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে কিনা তাও জানতে পারেননি। মামলা প্রত্যাহার না হলে তাদের সড়ক অবরোধ কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তারা।
বিহারী ও পুলিশের ৬ মামলা
বিহারী ক্যাম্পে পুলিশ-বিহারী সংঘর্ষ ও ৯ বিহারীকে ঘরে তালাবদ্ধ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে ও একজনকে গুলি করে হত্যার দায়ে পল্লবী থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়াউজ্জামান বলেন, মিরপুরের কালশির বিহারী ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় ৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে ১০ জনের হত্যার জন্য পুলিশ বাদী হয়ে একটি, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় একটি, বাকি চারটি স্থানীয়রা করেছেন। মামলাগুলো গতকাল সন্ধ্যায় ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ডিবির উপ-কমিশনার (পশ্চিম) শেখ নাজমুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, এখন মামলাগুলো ডিবি তদন্ত করবে।
৯ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের উপ-পরিদর্শক মমিনুর রহমান এবং পুলিশের উপর আক্রমণের ঘটনায় উপ-পরিদর্শক জাহিদুল হক বাদী হয়ে মামলা দুটি করেছেন। ত্রিমুখী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজনের মৃত্যু, এক যুবককে জবাই করে হত্যার চেষ্টা, গাড়ি ভাংচুর, লুটপাট, মারধর, চুরি, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে দায়ের অপর চারটি মামলা করেছেন ক্যাম্পের বিহারীরা। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো মামলা করেননি। এসব মামলায় বিহারী-বাঙালিসহ মোট তিন হাজার ২৫২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিপ্লব কিশোর শীল বলেন, আসামিদের ৯ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন— ফরিদ (৪০), আজাদ (৪৪), সাব্বির (১৮), আরিফ হোসেন (৩৪), জুয়েল (১৮), নাসিম (৪৫), সীমা (৩০), নবীর (৩৪) ও বদর উদ্দিন (২৮)। গতকাল তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক দু’দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ঘটনাস্থলের আলামত নিল সিআইডির টিম
পল্লবীর কালশি এলাকার বিহারীদের আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় তদন্তের জন্য গতকাল সিআইডির একটি টিম ঘটনাস্থলে যায়। নয় সদস্যের তদন্ত দলের দায়িত্বে ছিলেন পরিদর্শক প্রশান্ত কুমার দেবনাথ। দুপুর পৌনে ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত তদন্ত দল আলামত সংগ্রহ করে। পরে প্রশান্ত দেবনাথ বলেন, তদন্তের স্বার্থে তারা আলামত সংগ্রহ করছেন। এগুলো পরীক্ষার পর যথাযথ তদন্তকারীদের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করা হবে।
ঘটনাস্থলে মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি দল
রাজধানীর পল্লবীর কালশি কুর্মিটোলা এলাকায় বিহারী ক্যাম্প পরিদর্শন করেছে মানবাধিকার কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল। গতকাল বিকেলে প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলে ছিলেন মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (তদন্ত) হোসনে আরা আক্তার। কমিশনের সদস্য সচিব এমএ সালাম, সহকারী পরিচালক ফাতেমা ফারজানা, সুস্মিতা পাইক এবং গাজী সালাউদ্দিন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কমিশনের সদস্য সচিব এমএ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় তার নির্দেশে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। ঘটনাটি খুবই নিন্দাজনক। যে বা যারাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের খুব দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।’
ফিরে দেখা সেই দিনের ঘটনা
গত শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত কালশির কুর্মিটোলা ও মিল্লাত ক্যাম্পসহ আশেপাশের এলাকায় আতশবাজি-পটকা ফাটানোকে কেন্দ্র করে বিহারীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ হয়। এ সময় দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে কুর্মিটোলা ক্যাম্পের বাসিন্দা একই পরিবারের নয়জন দগ্ধ হয়ে মারা যায়। সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে শনিবার সকাল থেকেই ঐ এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
