২৫ বনদস্যু বাহিনীর হাতে জিম্মি সুন্দরবনের খেটে খাওয়া মানুষ

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৪, ২২:৪৩
‘বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ’ সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটারের মালিকানা বাংলাদেশের। বিশালায়তনের এই বনভূমির প্রায় অর্ধেকটা পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায়। সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার কয়রা এলাকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জনগণ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীর হলেও সেখানে তাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন নয়। জলদস্যু আর বনদস্যুদের উপদ্রবে তাদের জীবন ওষ্ঠাগত প্রায়। সুন্দরবনে যাতায়াতকারী এই জনগোষ্ঠীকে সেখানকার ভয়ংকর সব প্রাণিকে যেমন পরাস্ত করতে হয়, তেমনি মোকাবেলা করতে হয় সুন্দরবনের স্বঘোষিত মালিক দস্যুদের। নিয়মিত ঘটছে অপহরণ ও মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যার ঘটনা। সমপ্রতি শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত ওপেন হাউজ ডে’তে জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরি মঞ্জুরুল কবীর সুন্দরবনের বনদস্যুদের দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় বনজীবীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চান। জলদস্যু ও বনদস্যুর হাতে জিম্মি এই মানুষরা গোটা তিরিশেক ছোট-বড় দস্যুবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের ভয়ে সন্ত্রস্ত। বিভিন্ন সময়ে র্যাব-পুলিশের সঙ্গে ক্রসফায়ারে পড়ে কোনো কোনো বাহিনী প্রধান মারা পড়েছে। কিন্তু তাতে করে ঐ বাহিনীর কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। গোটা সুন্দরবন জুড়ে চলছে এসব দস্যুদের শাসন। তাদের সাফ কথা- বনে তাদের খাজনা দিতে হবে। বনজীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দস্যুরা কখনও তাদেরকে জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে, কখনো বা কথায় কথায় চালাচ্ছে নির্মম নির্যাতন। অনেক সময় রীতিমত জবাই করে মৃতদেহ নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে এসব দস্যুরা। মাঝেমধ্যে দস্যুদের নিজেদের মধ্যেই চলে আধিপত্যের লড়াই, বন দখলের যুদ্ধ। তাতে দস্যুদের অনেকে মারা পড়ে যখন তখন। জানা গেছে, এই দস্যুবাহিনীর দিকে অনেকটা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছে ডাঙ্গার দালাল আর গড ফাদার। ফলে অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাপ্লাই বাড়ছে, গড়ে উঠছে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ। বিশাল বনাঞ্চলের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায় প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবনে যাতায়াত করে। এদের কেউই দস্যুদের কবল থেকে রেহাই পায় না। কেননা, কৃষি প্রধান এই এলাকার মানুষ বনেই খোঁজে তাদের জীবিকা। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বনজীবীরা যেসব মহাজন বা ব্যবসায়ীর হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে যাচ্ছে অনেকক্ষেত্রে সেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গেই যোগসাজশ করে জিম্মি নাটক চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, সুন্দরবনের অপরাপর অংশের তুলনায় পশ্চিম সুন্দরবন বেশ গহীন। এছাড়া সুন্দরবনের ওপারে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার কারণে এই অংশটি দস্যুদের জন্য অনেকটা নিরাপদ। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে ২৫টি বাহিনী সুন্দরবন শাসন করছে, সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে জাহাঙ্গীর ও ইলিয়াস বাহিনী। আমিনুর বাহিনী, জোনাব বাহিনী, খোকাবাবু বাহিনী, রাঙা বাহিনী, রবিউল বাহিনী, লাল্টু বাহিনী, রেজা বাহিনী, ফরহাদ বাহিনী, জিয়া বাহিনী, হযরত বাহিনী ও মজিদ-ইউনুস বাহিনী। এসব বাহিনীর কাছে প্রচুর অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। এসব গ্রুপের দল নেতারা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে বিভিন্ন সময়। আবার গ্রুপের সদস্যদের মাঝ থেকেই নতুন নেতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশি বনদস্যুদের পাশাপাশি ভারতীয় আকাশ বাহিনী ও সুকুমার বাহিনী নামের আরও দুটি শক্তিশালী বাহিনীর উপস্থিতি সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাঝেমধ্যে টের পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, মোস্তাফিজ কোম্পানির ট্রলার থেকে তার ভাই মামুনকে জিম্মি করে নির্দিষ্ট সময়ে টাকা না পেয়ে তাকে জবাই করে নদীতে ফেলে দেয়া কানাই বাহিনীর প্রধান সমপ্রতি মারা যাওয়ার পর তার সেকেন্ড ইন কমান্ড সুকুমার বাহিনীর দায়িত্বভার নিয়েছে। সমপ্রতি সরকার বনদস্যুদের অপতত্পরতার বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। ইতিমধ্যে সুন্দরবনের উভয় অংশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বেশ কয়েকটি সফল অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। তারপরও কোনভাবেই এসব দস্যুদের তত্পরতা কমছে না। এ ব্যাপারে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন, সমপ্রতি ওপেন হাউজ ডে’তে যেসব বাহিনীর নাম উঠে এসেছে তাদের প্রকৃত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। যাচাইয়ের পর পুলিশের বিশেষ টিম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।