জীবন যাপনের ফিকশ্চার

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২০:০৫
পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে এখন ফুটবলের উন্মাদনা। চারিদিকে বিশ্বকাপের হাওয়ায় ভাসছে ফুটবলপ্রেমীরা। সড়ক ও বিল্ডিংয়ে প্রিয় দলের পতাকা পত্পত্ করে উড়ছে। প্রতিদিন রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবলের পছন্দের দলের খেলা দেখছে কোটি কোটি মানুষ। আর এই চিত্রটা আমাদের দেশেও বিদ্যমান। বিশ্বকাপের হাওয়ায় আমাদের যাপিত জীবনে এসেছে পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের নানা গল্প নিয়ে এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ চার বছর পর বসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল। তাই তো এই বিশ্বকাপকে ঘিরে এত আয়োজন ও উত্তেজনা। বিশ্বকাপের খেলাগুলো রাত জেগে দেখার আনন্দই অন্যরকম। বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা ছুঁয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদিদেরও। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশ না হয় এক অতিনগণ্য শক্তি, ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান না হয় ১৬০ নম্বরে, তাই বলে কি বিশ্বকাপ নিয়ে উচ্ছ্বাস করবে না বাংলাদেশি ভক্তরা? দক্ষিণ আমেরিকার মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের রঙে বাংলাদেশও তাই রঙিন হয়ে উঠেছে । এক. বড়ভাই ব্রাজিলের সমর্থক। ঘরের দেয়ালে তাই ঝুলিয়ে দিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সুপারস্টার নেইমারের ছবি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছোটভাই রাশেদের পছন্দ হচ্ছে না বিষয়টা। কারণ তার পছন্দের দল আর্জেন্টিনা। নেইমারের পাশে তাই মেসির ছবি ঝুলিয়ে দিয়েছেন তিনি। বাড়ির ছাদে শোভা পাচ্ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। এরই পাশে কেউ একজন আবার টানিয়ে দিয়েছেন স্পেনের পতাকা। অদূরেই এক বাড়ির ছাদে শোভা পাচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির পতাকাও। পতাকায় ঢাকা পড়ে গেছে এই নগরী। বিশ্বকাপ উপলক্ষে পাড়া-মহল্লায়, অলিতে-গলিতে, বড় বড় দোকানে, বাসার ছাদে, গাড়িতে, পোশাকে ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সর্বত্রই চোখে পড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। বাতাসের দোলায় পতাকাগুলো যেন স্বমহিমায় উড়ছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ পাড়া-মহল্লায় ও পথে-ঘাটে সর্বত্রই পতাকা ফেরি করে বেড়াচ্ছে ফেরিওয়ালারা। তাদের বাঁশের কঞ্চিতে শোভা পাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দেশের নানা রঙের ও আকৃতির পতাকা। নগরীর গুলিস্তান, ফার্মগেট, শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্টন, মিরপুর, গুলশান ও বনানীতে পতাকা বিক্রেতাদের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের পতাকা ফেরি করতে দেখা যাচ্ছে। দুই. বিশ্বের মতো বাংলাদেশও ফুটবলের জোয়ারে ভাসছে। মাঠে গিয়ে খেলা দেখা না-ই বা হলো। ঘরে বসেই বিশ্বকাপের খেলা দেখতে ফুটবলপ্রেমীরা কেউ কেউ নতুন টেলিভিশনও কিনেছেন। ‘বিশ্বকাপের খেলাগুলো রাত জেগে দেখার আনন্দই অন্যরকম’, বলে জানালেন একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত দিলশাদ হাসান। তবে শুধু রাত জেগে খেলা দেখলে পরদিন সকালে অফিসে কাজের সময় অমনোযোগী হলে বসের ধমক খাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। আর যারা শিক্ষার্থী তাদের রাত জেগে খেলা না দেখাই ভালো। কেননা রাত জাগলে পরদিন সকালের ক্লাসে দেরি হবে ঠিকই। সেজন্য শিক্ষার্থীরা পরদিন সুযোগ বুঝে খেলার রিটেলিকাস্টটা দেখে নিতে পারেন। আর সপ্তাহে একদিন হয়তো প্রিয় দলের ম্যাচটি রাত জেগে দেখলেও সে রাতে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি পান করতে হবে। তা না করলে শরীর খারাপ করতে পারে। এজন্য অভিভাবকদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে। তিন. বিশ্বকাপ নিয়ে সর্বত্রই চলছে আলোচনার ঝড়। চায়ের আড্ডায়, বাসে, ক্যাম্পাসে কোথায় নেই বিশ্বকাপ আলোচনা। প্রবীণদের মুখে দশ নম্বর জার্সির পেলের বলের জাদুর রেশ এখনও মিলিয়ে যায়নি। মধ্যবয়সী ও তরুণরা ম্যারাডোনা ম্যানিয়ায় এখনও মত্ত। উঠতি তরুণ ও বর্তমান প্রজন্ম অস্কার, হাল্ক আর মেসিকে নিয়ে এখনই সে কী তোলপাড়! গ্রাম-শহর সবখানেই ফুটবল ম্যানিয়ায় আক্রান্ত ছেলে-বুড়ো সবাই। শুধু ঢাকা মহানগরীই নয়, দেশের প্রতিটি হাট-বাজার ও বন্দরে এমনকি চায়ের দোকানের আলোচনা শুধু বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাকে নিয়ে। এইসব ফুটবলপ্রেমীর মধ্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকই বেশি। স্বভাবতই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত। কেউ আর্জেন্টিনা আর কেউবা ব্রাজিল। কোনো দলের সমর্থক কম নয়। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে চলে সবার মাঝে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। তর্ক-বিতর্কের কোনো শেষ নেই। ফুটবলপ্রেমীরা যার যার সমর্থনের দলের কথা তার তার কাছে প্রিয়। কেউ বলে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হবে আবার অন্যরা বলে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হবে। দুদলের ভক্তরাই শত শত পতাকা উড়িয়ে আকাশ ছেয়ে দিয়েছে। পাল্লা দিয়ে কে কত পতাকা উড়িয়ে সমর্থন করতে পারে তার প্রিয় দলকে। এখানেই শেষ নয়, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের একেকটা পতাকা ২০-৩০ ফুট লম্বা। আবার কে কত উঁচুতে ওড়াতে পারে এ নিয়েও রয়েছে প্রতিযোগিতা। চার. ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মেতে উঠেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসজুড়ে ফুটবলকে নিয়ে উত্সবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। কেউ আর্জেন্টিনা, কেউবা ব্রাজিল, কেউ ইতালি আবার কেউ বা ফ্রান্স; এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে চলছে তুমুল আলোচনার ঝড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে শোভা পাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের পছন্দনীয় দলের পতাকাগুলো। তবে সেখানে যথারীতি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকার পরিমাণই বেশি। আবার কেউ মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিচ্ছে, জোর গলায় বলছে তার দল জিতবেই। পুরো ক্যাম্পাসে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থকই সবচেয়ে বেশি, অন্য দলেরও আছে তবে অনেকটাই কম। ক্যাম্পাসে আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের ফুটবল খেলাও হচ্ছে মাঝে মাঝে। আর খেলা শেষে ক্যাম্পাসজুড়ে মিছিল তো আছেই। এদের মধ্যে আবার অনেককেই বাজি ধরে খেলতে দেখা যাচ্ছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে, খেলাটা ব্রাজিলে নয়, যেন ক্যাম্পাসগুলোতে। পাঁচ. বিশ্বকাপ ফুটবল—বিশ্ব ভ্রাতৃত্বকে জানান দেয়। তাই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স বা অন্য কোনো দেশের পতাকা নিজেদের করে নেই এই এক মাস। ৩২ দলের বিশ্বকাপ আমাদের জন্য হয়ে ওঠে উত্সবের উপলক্ষ। ১৩ জুলাই এই ৩২ দেশেরই কেউ হাসবে শেষ হাসি। বাংলাদেশ কবে এমন হাসি হাসার সুযোগ পাবে এর উত্তর সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ বিশ্বসেরা তো দূরের কথা, নিজ মহাদেশ এশিয়া সেরা হওয়াই এখনো সুদূরপ্রসারী বিষয় বাংলাদেশের কাছে। তবুও বিশ্ব ফুটবলের এমন আসর নিয়ে উন্মাদনার কমতি নেই বাংলাদেশের ক্রীড়ামোদীদের মাঝেও। আমাদের বাড়ির ছাদে এখন উড়ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা স্পেনের মতো বিশ্বসেরা ফুটবল দেশগুলোর পতাকা। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে স্থান করে নিচ্ছে নেইমার, মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর মতো বিশ্বসেরা ফুটবল তারকার ছবি।