বেড়ানো : অপূর্ব সুন্দর হাম হাম ঝরনা

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৪, ২০:০৫
হাম হাম নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ। আসলেও তাই! তবে দে ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা সেই রহস্য ভেদ করে হাম হামের বুক চিরে পৌঁছে গিয়েছিল একেবারে শেষ প্রান্তে। ঢাকা থেকে রাত ৯টার গাড়িতে চেপে শেষ রাতে শ্রীমঙ্গলে গিয়ে পৌঁছাই। আগে থেকেই হোটেলে রুম বুকিং করা ছিল। ফলে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। রুমে গিয়ে দুই ঘণ্টা মরিচ পোড়া ঘুম (বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে থাকা)। ভোর সাড়ে ৫টায় সিএনজি চালকের কলে ঘুম ভাঙে। ঘড়িতে তাকিয়ে অবাক হই, একজন গাড়ি চালকের সময়জ্ঞান দেখে। যেমন কথা তেমনি কাজ। অথচ যাদের থাকার দরকার তারা কেউ নেই। ফ্রেস হয়ে পথে বের হয়ে পড়ি। আমাদের পাঁচজনকে সিএনজির কাঁধে ও পেটে পুরে ড্রাইভার স্বপন বীরদর্পে ছুটে চলে। মাঝে আদমপুর বাজারে ব্রেক। নাশতা পর্ব ও শুকনো খাবার কেনা হলো। গাড়ি থামল কমলগঞ্জ উপজেলার কোরমা বনবিটের আওতাধীন কলাবনে। কথামতো গাইড সুমন উপস্থিত। তার হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গি আমাদের বিমোহিত করল। গাইড পাঁচজনকে ৫টি বাঁশের লাঠি ধরিয়ে দিল। শুরু হলো মূল পর্ব। বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া হাম হাম জলপ্রপাতের অবস্থান। কমলগঞ্জ উপজেলার কলাবন থেকে দু’ ভাবে সেখানে যাওয়া যায়। যারা পাহাড়, টিলা, ট্রেকিং করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য একটি পথ আর যারা তুলনামূলক কম পরিশ্রমে যেতে চান তাদের জন্য ঝিরি পথ। আমরা দ্বিতীয়টি বেছে নিলাম। লাঠিতে ভর দিয়ে হেলেদুলে কখনোবা গাইডের পুরোপুরি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। হাম হামের অবিরাম জলে দুই পাহাড়ের মাঝে সৃষ্ট ঝিরিপথ দিয়ে যাচ্ছি। মাত্র বছর পাঁচেক হলো এই ঝরনাটি আবিষ্কার হয়েছে। তাই এখনও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য শতভাগ বিদ্যমান। পথের নজরকাড়া নিসর্গ, হিম হিম ঠাণ্ডা পানি, ছায়াশীতল প্রকৃতি ভ্রমণপিপাসুদের দেয় বাড়তি আনন্দ। প্রায় দের ঘণ্টা হাঁটার পর আনু মিয়ার মুলি বাঁশের মাচা পাতানো চায়ের দোকানে খানিকটা সময় চা পানের বিরতি হলো। তার কথায় জানতে পারি উনিই নাকি প্রথম হাম হাম জলপ্রপাত আবিষ্কারক। সত্য-মিথ্যা কতটা সেদিকটায় না গিয়ে তার কাছ থেকে জায়গাটির সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিই। আলাপচারিতায় জানা হলো ইতোমধ্যে আরও একটি জলপ্রপাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এখনই পর্যটকদের যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। প্রায় আরও ১ ঘণ্টা চড়াই-উত্রাইয়ের পর পৌঁছলাম মায়াময় অপার সৌন্দর্যের হাম হাম জলপ্রপাত। এ জীবনে বেশ কয়েকটি জলপ্রপাত দেখেছি। তবে কোনোটির সঙ্গে কোনোটির তুলনা হয় না। প্রতিটির সৌন্দর্যই ভিন্ন ভিন্ন আবেশের, ভিন্ন কোনো এক অনুভূতির। এবার পানির উত্স খোঁঁজার জন্য দে ছুটের দল সবচেয়ে উঁচু ও খাড়া একটি পাহাড় ট্রেকিং করার জন্য রওনা হলো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এবারই প্রথম আমিসহ আরও দু’জন ব্যর্থ হলাম। খুব সকালে বের হওয়াতে অনেক সময় নিয়ে প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি। এবার ফেরার পালা। বিকেল ৪টায় যেন ঘোর সন্ধ্যা। পথ চলছি, হঠাত্ ঝুপ করে বাঁশ গাছ থেকে ঠিক আমার পাশেই একটি সাপ লাফ দিয়ে ব্যাঙ ধরে নিল। মুহূর্তেই ঘটনাটি ঘটল, মনে হলো ডিসকভারি চ্যানেলের ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য বাস্তবে দেখছি। বন, জঙ্গল, পাহাড় জলাশয় অনেক ঘুরেছি; কিন্তু এত কাছ থেকে এমন দুর্লভ দৃশ্য কখনও চোখে পড়েনি। জলপ্রপাতের উত্স দেখতে না পারার যে বেদনা ছিল তা নিমিষেই বিলীন হয়ে গেল। গাইডের মাধ্যমে জানতে পারলাম, সাপটি ছিল বিষাক্ত দাড়াশ। বর্ষা মৌসুমে হাম হাম যাওয়া আসার পথে এমন দুর্লভ মুহূর্ত অনেক ভ্রমণপিপাসুর জীবনেই আসে। এখন পুরোপুরি ফুরফুরে মেজাজে পথ চলছি। মনে হলো এ পথ দিয়ে যেন আগে কখনও আসিনি। যত দেখছি ততই লাগছে ভালো। হাম হাম সত্যিই তুমি আমাদের ভালোবাসার মায়ায় জড়ালে! সব মায়ার জাল ছিন্ন করে কলাবন এসে হাজির। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। চট আর মুলি দিয়ে ঘেরা এক খাবার হোটেলে ঢুকি। ডিম ও ডাল দিয়ে পেট চুক্তি ৩৫ টাকা। পেটে ক্ষুধা তাই অমৃত স্বাদ মনে হলো। খাবারের পর্ব শেষ। সিএনজি স্টার্ট। রাতেই ফিরব যান্ত্রিক শহর ঢাকার পথে। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের হাম হাম জলপ্রপাত ভ্রমণে সহযোগিতা করার জন্য বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শ্রী তাপস মজুমদার ও ভ্রমণবিলাসী শ্রী সুজনকে আন্তরিক ধন্যবাদ। যোগাযোগ :ঢাকার গাবতলী, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ থেকে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস যায় শ্রীমঙ্গলে। রাতযাপনের জন্য বেশ কয়েকটি ভালো মানের হোটেল রয়েছে। স্থানীয়দের আচার-ব্যবহারও পর্যটনবান্ধব।