বিষ্ণু দাশ
লেখক ও গবেষক
লেখা পড়া শুরু করেছিলাম নিজ গ্রামের আপন গৃহে, বর্তমান পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া গ্রামে। তখন আমার বয়স পাঁচ বছরের অধিক হবে না। মুকুন্দ দাদুর কাছেই লেখা পড়ার হাতে খড়ি। অক্ষর শিক্ষার জন্য খাতা কলম থাকলেও আমি অক্ষরগুলো শিখেছিলাম তাল পাতার উপর লোহা দিয়ে বড় বড় করে লেখা অ, আ, ঈ, ঈ ....অক্ষর গুলোর উপর কলম ঘুূড়িয়ে। কাঠ কয়লাগুরো করে তৈরি করা হতো কালি এবং কাশ ফুল গাছের কান্ড দিয়ে তৈরি করা হতো কলম। এটাই ছিল অক্ষর শেখার একটি উত্তম পদ্ধতি।
সকাল হলেই শুরু হতো মুকুন্দ দাদুর পাঠশালা। আসন করে বসিয়ে চটে মোড়ানো তালপাতাগুলো সামনে রেখে দেয়া হতো। অতপর মাথা মাটিতে ও কপালে একটি খাগের (কাশ ফুল গাছের কান্ডের তৈরি) কলম রেখে দেবী সরস্বতীর প্রার্থনা করতে হতো। প্রার্থনার মূল বিষয় ছিল এস দেবী সরস্বতী, আমার কপালে এসে বস, তোমার বিদ্যা শক্তি আমায় দান করো ইত্যাদি ইত্যদি। কলম কপালে লেগে থাকাটা ছিল ভাল লক্ষণ অর্থাত্ দেবী সরস্বতী আমার কপালে এসে বসেছে। আর যদি কলম কপালে লেগে না থাকত, দাদু বলত তোর লেখা পড়া হবে না। কলম কপালে খুব জোরে চেপে ধরেও কপালে লাগানোর চেষ্টা করতাম। দুই এক দিন সফলও হয়েছিলাম।
একবার সরস্বতী পূজার সময় আমার কপালে কলম লেগেছিল দেখে দাদু অবাক হয়েছিলেন। ঘঁটনাটি ছিল কলমের সাথে জিকা গাছের আঠা মেখে রেখেছিলাম। স্মৃতি পটে এ ঘটনাটি মনে হলে আজও হো হো করে হেসে উঠি।
পাঁচ ছয়মাস পরেই স্কুল পাল্টিয়ে কাজী বাড়ীর আবদুল করিমের পাঠশালায় যেতে শুরু করলাম। বাড়ীর তিন পাশে ঘিরেই বয়ে চলত ছোট একটি খাল। খালটিতে জোয়ারের সময় জলে ভরে যেত। আবার ভাটির সময় তিন/ চার হাত জল থাকত। এ খালের ওপাড়েই ছিল এ পাঠশালাটি্। এ পাঠশালায় শিক্ষক ছিলেন মাত্র দুইজন। বেশির ভাগ দিনই খাল পেড়িয়ে চটে পেচানো তালপাতাগুলো নিয়ে পাঠশালায় যেতাম। মা খালে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত। জোয়ারের সময় অনেকদৃুর ঘুরে পাঠশালায় যেতে ও বাড়ী ফিরতে হতো।
স্কুলে পৌছেই যত দ্রুত ২০ থেকে ২৫ টি তাল পাতা কয়লার কালী দিয়ে লিখে স্যারকে বলতাম- স্যার আমার লেখা হয়ে গেছে্। আমার ছুটি। স্যার টেবিলের উপর মাথা রেখে অধো আধো ঘুমে বলতেন - মুছে ফেলে আবার লেখ্। লেখা শেষ হলে বাল্য শিক্ষর নিত্যবাক্যগুলো উচ্চস্বরে সকলকে পড়তে বলতেন-সদা সত্যকথা বলিবে, মিথ্যা কথা বলা মহা পাপ, অসত্ সঙ্গ ত্যাগ কর ইত্যাদি ইত্যাদি। তার পরে দশঘর পর্যন্ত নমতা পড়েই ছুটি। আনন্দ আর ধরে না। চটে পেচানো লেখা পড়ার উপকরণ গুলো নিয়ে এক দৌড়ে খালের পাড়ে। মা মা বলে চিত্কার করতাম। মা একটি গামছা ছুড়ে মেরে বলতেন -গামছাটা পড়ে চলে আয়। গামছা পরে চটের পোটলাটি নিয়ে নদী পারাতাম। এটাই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
একদিন খাল পার হওযার সময় গামছাটা জলের মধ্যে কোথায় যে হারিয়ে গেল, আর খুজে পেলাম না। দিগাম্বর হয়ে গামছা খুজতে গিয়ে চটের ভিতরের তালপাতা গুলোও নদীর স্রোতে ভেসে গেল। এখন শ্যাম রাখি না কূল রাখি, এ অবস্থায় বাড়ী ফিরতে হলো। এ কথাগুলো আজও স্মৃতি পটে ভেসে উঠছে। কিন্তু মিলাতে পারছি না সেকালের সাথে একালের প্রাণহীন পাঠশালার কথা, লেখা পড়ার কথা, দৌড় ঝাপ দেয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার কথা, ভালোবাসার কথা, প্রকতির কোলে ঘুমিয়ে পরার কথা, কাদা মাটি দিয়ে তৈরি শ্লেটের উপর আঙ্গূল দিয়ে অক্ষর লেখার কথা।
