বিহারীদের সঙ্গে ফের সংঘর্ষ

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৪, ২২:০৪
রাজধানীর মিরপুরে বিহারীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকজন অবাঙালি আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ২টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত মিরপুর-১১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত শনিবার ১০ বিহারীকে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কুর্মিটোলা ক্যাম্পের সামনের ডিওএইচএস সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিহারীরা। দুপুরে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে মিল্লাত ক্যাম্পের বিহারীরা কুর্মিটোলা ক্যাম্পে মিছিল নিয়ে আসার সময় মিরপুর ১১ নম্বর মূল সড়কে কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর চালায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এক পর্যায়ে পরিবহন শ্রমিকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। বেঁধে যায় দু’ পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ঘটনার সময় ব্র্যাক ব্যাংক পল্লবী শাখার কাঁচের দেয়াল ভাংচুর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ব্যাপারে পল্লবী থানার ওসি সৈয়দ জিয়াউজ্জামান জানান, কোন মিছিল বা প্রতিবাদ সমাবেশ ছাড়াই মিল্লাত ক্যাম্প থেকে অবাঙালিরা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় নামে। তারা যানবাহনের উপর কোন কারণ ছাড়াই হামলা চালায়। এসময় পরিবহন শ্রমিকরা একজোট হয়ে তাদের ধাওয়া দেয়। অবাঙালিরা ঢুকে পড়ে ক্যাম্পে। এদিকে, দুপুরে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপেট্রিয়েশন কমিটির (এসপিজিআরসি) নেতারা স্থানীয় (ঢাকা-১৩ আসন) সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে দেখা করে তাদের কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। দাবিগুলো হল: কালশীর ঘটনায় ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে আটকৃতদের মুক্তি ও সারাদেশের ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা প্রদান। এই বৈঠক শেষে জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি সাংবাদিকদের বলেন, অবাঙালিরা কিছু দাবি তুলে ধরেছেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে। ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা ও মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে। কালশীর ঘটনায় দোষী যেই হোক, ছাড় পাবে না। তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে। এ সময় তিনি শন্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের জন্য অবাঙালিদের প্রতি অনুরোধ জানান। এসপিজিআরসি’র জেনেভা ক্যাম্প শাখার সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী বলেন, সংসদ সদস্যের কাছে তারা কিছু দাবি জানিয়েছেন। তিনি তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে, পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, বৈঠকে অবাঙালিদের তুলে ধরা দাবিগুলোর ব্যাপারে আজ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বৈঠক হবে। এদিকে, কালশীর ঘটনায় শনিবার রাতেই একটি হত্যা মামলাসহ পল্লবী থানায় ৬টি মামলা হয়। এই ৬ মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি মামলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত অবাঙালিদের আসামি করা হয়েছে। ৬ অবাঙালিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে। শুধু হত্যা মামলার আসামি অজ্ঞাত। তবে হত্যা মামলায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পর পুলিশের সমন্বয়ে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘটনার দিন হামলা ও সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেয়া পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানাকে গোয়েন্দা পুলিশ খুঁজছে। ঘটনার সময় জুয়েল রানা অবাঙালি ইয়াসিন আলীর ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছে। পুলিশের উপস্থিতিতে এ হামলা চলাকালে জুয়েল রানার সাথে স্থানীয় যুবলীগের গেসু, বিল্লাল, জাহিদ, হেলু ও জালাল ছিলেন বলে গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। দায়ের করা ৬ মামলার তদন্ত সম্পর্কে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জানান, ৬ মামলার তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর ঘটনাস্থল ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। অধিক গুরুত্ব দিয়ে মামলার তদন্ত কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। কে এই জুয়েল রানা : কুর্মিটোলা ক্যাম্পে হামলার অন্যতম উস্কানিদাতা পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা পঞ্চম শ্রেণী পাস। তার বাবা রিকশা চালক। ৭ বছর আগেও এলাকায় তিনি পরিচিত ছিল বেকার যুবক হিসেবে। কিন্তু গত কয়েক বছরে কম করে হলেও ৫০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন রানা। বনানীর ডিওএইচএস এলাকায় রয়েছে তার ফ্ল্যাট। রূপনগর, বেগুনটিলা, বাউনিয়া বাঁধ, পলাশ নগর ও লালমাটিয়া এলাকায় সরকারি খাস জমি দখলে নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সর্বশেষ বাউনিয়া বাঁধ স্লুইচ গেট এলাকায় সরকারি জায়গায় গড়ে তুলেছেন রাজু বস্তি। এ বস্তি থেকে প্রতিমাসে ভাড়া আদায় করে আড়াই লাখ টাকা। দুই মাস আগে বাউনিয়া বাঁধ ডি-ব্লকে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে। পরে ঐ তরুণী লজ্জায় আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে পল্লবী থানায় মামলা হয়। মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ জুয়েল রানাকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হলেও রহস্যজনক কারণে রিমান্ডে আনতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে জামিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।