জাবেদের বয়স সে জানে না। দেখে মনে হয় ১০ বছরের মতো। সোনা মিয়া, রোজিনা, রুবেল জানাল - তাদের কারো বয়স নয়, কারো দশ, কারো এগার। এই শিশুরা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকার ধোলাই নদীর পাথর শ্রমিক। সকালে-বিকালে কিংবা কাঠফাটা রোদে পাথর টানে ওরা। সরকারের সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম আওতায় এখনও ওরা আসেনি। ওদের অভিভাবকরা বলেছেন, স্কুল থাকলে তাদের সন্তানরা পড়াশুনার সুযোগ পেত।
জাবেদ জানাল, তারা মূলত ভাসমান মানুষ। মা-বাবার সঙ্গে সে এই এলাকায় আসে বর্ষার শেষে। থাকে সাত থেকে আট মাস। আবার বর্ষার শুরুতে তারা অন্যত্র চলে যায় কাজের সন্ধানে। প্রতিদিন পাথর টেনে ২০ থেকে ৪০ টাকা পায়। তার মা বাড়িতে থাকেন, বাবা পাথর শ্রমিক। স্কুলে যাও না কেন এমন প্রশ্নে জাবেদের উত্তর এই এলাকায় স্কুল নেই, দূরে স্কুল আছে। কিন্তু সেই স্কুলে গেলে কাজ করা যাবে না। কাজ করে যে টাকা পাই তা সংসারের কাজে লাগে।
এই সংসারের জন্যই রোজিনা পাথর শ্রমিক। বাবা অসুস্থ। মা-মেয়ের আয়ে সংসার চলে। পাথর টানতে তাদের কষ্ট হয়। ঝুড়ি ভরে পাথর নেয় তারা। তা বয়ে নিতে গিয়ে হাতে-পায়ে ব্যথা হয়। দুই একবার পাথরে পড়ে গিয়ে হাত-পা ছিলে যায়। তবে এগুলোকে খুব একটা পাত্তা দেয় না ওরা।
তবে শিশুদের এমন ভারী কায়িক শ্রমের তীব্র বিরোধিতা করলেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, এতো ভারী কাজে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, মেরুদণ্ডে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি ব্যথা তৈরি হয়। ঘাড়ে ব্যথাসহ নানারকম জটিল শারীরিক সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকার অর্থনীতি পাথর নির্ভর। রাস্তা-ঘাট ভাঙ্গাচোরা। অনেক বাড়িতে যেতে রাস্তাই খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্ষার দিনে মাথায় করে সন্তানসম্ভবা মাকে চিকিত্সকের কাছে নেয়া এখানে খুব স্বাভাবিক একটি দৃশ্য। এমন দুর্গম এলাকায় কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় ছেলে, বুড়ো, নারী, পুরুষ সকলেই পাথরের কাজ করে। এই কাজে ভাসমান শ্রমিকের পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকেরও দেখা পাওয়া যায়।
১ নং পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সামসু মিয়া বললেন, গরিব বাবা-মা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। বরং কাজ করে তারা কিছু টাকা রোজগার করলেই তারা খুশি। এলাকায় সব সময় রাস্তায় ভারী ট্রাক-লরি চলাচল করে। এই পরিবেশে শিশুদের স্কুলে যাওয়াটাও কঠিন। তাছাড়া ডাকঘর, দক্ষিণ পাড়া, উত্তর পাড়ায় কোন স্কুল নাই। এই এলাকায় সরকার কয়েক বছরের মধ্যে কোন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেনি। স্থানীয়দেরও এ বিষয় মাথা ব্যথা নেই। তবে কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তুলনামূলকভাবে ভাল এলাকায় কিছু স্কুল করেছে। যা শিশু শিক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
কোম্পানীগঞ্জের এই এলাকায় যে কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, ব্র্যাক তাদের মধ্যে অন্যতম। স্থানীয় ব্র্যাক অফিস থেকে জানা গেলো, ভোলাগঞ্জ ও এর মতো দুই একটি দুর্গম এলাকায় তাদের স্কুল না থাকলেও অন্য প্রায় সব ইউনিয়নে তাদের প্রাক প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। তাদের রয়েছে ৭৩টি প্রাথমিক ও ২৬টি প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়। জেলায় ব্র্যাক শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে ১৯১০ জন শিক্ষার্থী।
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির পরিচালক ড. শফিকুল ইসলাম জানালেন, দুর্গম এলাকার শিশু ও অভিভাবকদের শিক্ষার প্রতি অনেক আগ্রহ রয়েছে। আমরা দেখেছি তারা আমাদের সহযোগিতা করে এবং সমাপনী পরীক্ষায় ভাল করে। প্রায় সকল দুর্গম এলাকায় পর্যায়ক্রমে আমাদের স্কুল করার পরিকল্পনা আছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০ থেকে ৩০ জন শিশু নিয়ে আমাদের স্কুল চলে। একটি টিনের কাঁচা ঘরের স্কুলে একজন শিক্ষিকা পড়ান বাচ্চাদের। বই খাতার সঙ্গে নানা অনুসঙ্গ দিয়ে চলে শিক্ষা কার্যক্রম।
সরকারের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এই শিশুদের আনার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সিলেট জেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার মোঃ আবদুল ওয়াহেদ জানান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার। তাছাড়া ভোলাগঞ্জের আদর্শগ্রামে সরকারি স্কুল আছে। যে সকল জায়গায় স্কুল নেই সেখানে স্কুল করে সকলের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
