বাংলাদেশকে একটি গরীব দেশ হিসাবেই জানত লেবানীজরা। ভাবত, এদেশের বেশিরভাগ মানুষ খেতে পায় না। অবশ্য এমন ভাবনার কারণও আছে। বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ গৃহকর্মী কাজ করে ওখানে। যাদের বেশিরভাগই নারী। লেবাননের লোকজন মনে করত, না খেতে পেরে তারা এখানে এসেছে কাজ করতে।
অবশ্য এই ধারণা ভাঙ্গতেও খুব একটা সময় লাগেনি। লেবানীজদের এই মস্ত ভুল ভেঙ্গে দিয়েছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী মিশন। আরেক দেশে এসে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে এক ভিন্ন বাংলাদেশের ছবি একে দিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
২০১০ সালে সর্বপ্রথম নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ ওসমান ও মধুমতি লেবাননের শান্তিরক্ষা মিশনে (ইউনিফিল) অংশ নেয়। জাতিসংঘের মেরিটাইম টাস্কফোর্সের অধীনে ভূমধ্যসাগরে তারা টহল দিত। এসময় জাতিসংঘের পতাকার সঙ্গে উড়েছে বাংলাদেশের লাল সবুজে পতাকা। ইসরাইলের জলসীমার কাছে নিয়মিত মহড়ায় অংশ নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের নাম। লেবানীজরা জানতে পারে তাদেরই জলসীমার নিরাপত্তা প্রদানে এসেছে বাংলাদেশ। যারা শুধু গৃহকর্মীর কাজই করে না, অন্য দেশেরও নিরাপত্তায় কাজ করে। লেবাননের সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে জানতে পারে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধশালী দেশ।
লেবাননের ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ জনের সঙ্গে ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধির আলাপ হয়। বাংলাদেশ সম্পর্কে কি জানো জানতে চাইলে তারা বলেন, দেশটা সুন্দর। আগে ধারণা ছিল শুধু কাজের জন্য নারী-পুরুষ আসে এখানে। কিন্তু আমাদের ভুল ভেঙ্গেছে তোমাদের নৌবাহিনী দেখে।
জানা গেছে, লেবাননের বিভিন্ন দুর্যোগে সাহসিকতা দেখিয়েছে নৌবাহিনী। শীত মৌসুমে লেবাননে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। ঐ সময় সাধারণ জলসীমার নিরাপত্তা বলতে কিছু্ থাকে না। পুরো সাগর নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইউনিফিলে অংশ নেয়া উন্নত দেশের নৌ বাহিনী নিরাপদে আশ্রয়ে চলে গেলও যায়নি বাংলাদেশ নৌ বাহিনী। সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূমধ্যসাগরের নিয়মিত টহল দিয়ে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী। যা লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সাড়া ফেলে। লেবানন নৌ বাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল নাজিফ আল জিবলিসহ গোটা সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা এর প্রশংসা করেন।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সহকারী প্রধান রিয়াল এডমিরাল এ এমএমএম আরঙ্গজেব চৌধুরী লেবাননের নৌ বাহিনীর প্রধানের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাত্ করতে গেলে তিনি সেই দুঃসাহসিক কার্যক্রমসহ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও জলসীমায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয় লেবানন নৌ বাহিনীকে প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভূমিকার জন্যও সাধুবাধ জানান তিনি।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে প্রতিটি দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের সুনাম। কোন কিছু ক্রয় করার আগে দোকানের সেলসম্যান জিজ্ঞাসা করেন। তুমি কোত্থেকে এসেছ। বাংলাদেশ বলার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সেই দুঃসাহসিক কার্যক্রমের কথা বলে গুড গুড বলতে থাকে। ৭টি শপিং মলে গেলে সেখানে লেবানীজদের মুখে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ কথা শোনা যায়। এছাড়া বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সহকারী প্রধান রিয়াল এডমিরাল এএমএমএম আরঙ্গজেব লেবাননের আমর্ড ফোর্সেসের প্রধান মেজর জেনারেল ওয়ালিদ সালমান, ইউনিফিলের ফোর্স কমান্ডার মেজর জেনারেল পাউলোচেরার সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে গেলে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী সম্পর্কে একই কথা বলেন। বাংলাদেশের প্রশংসা করেন মেরিটাইম টাস্কফোর্সের কমান্ডার রিয়ার এডমিরাল ওয়াল্টার এডওয়ার্ড বোমবার্ডার। লেবাননে অবস্থানকারী নারী পুরুষদের এক সময় নিচু চোখে দেখা হলেও এখন তারা পান বিশেষ সন্মান। বৈরুতের বিভিন্ন এলাকা অবস্থানরত রাবেয়া (২৫), মনির হোসেন (শপিং মলে কর্মরত) ও সোবহান, মরিয়ম (২৫), ইয়াছমিন (৩০), তাসলিমা (২৮) ও পারভীন (২৫) একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি করেন। ১০ জুন বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর সহকারী প্রধান এডমিরাল এএমএমএম আরঙ্গজেব চৌধুরীর সঙ্গে লেবাননে একটি মিডিয়া দল যান।
