প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলে চিকিত্সকদের চাকরি স্থায়ী করা হবে না এবং পদোন্নতিও দেয়া হবে না। এমনকি তারা চাকরিও হারাতে পারেন। চিকিত্সকদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে পর্যায়ক্রমে সব অঙ্গীকার পূরণ করবে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রত্যেক বিভাগে একটি করে চিকিত্সা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অফিস করেন। ৩৬ মিনিটের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। বেলা ১০টায় তিনি এই মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান। এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তাকে স্বাগত জানান।
চাকরির শর্তানুযায়ী চিকিত্সকদের নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে এবং সেবার মানসিকতা নিয়ে চিকিত্সা সেবা দিতে চিকিত্সকদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে রাখতে হবে, আপনাদের পেছনে যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় তা কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের ট্যাক্স থেকে আসে। এজন্য আপনাদের কর্মস্থলে থেকে অবশ্যই জনগণের সেবা দিতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের চালানো বর্তমান প্রচারণার শ্লোগান, ‘দুইটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ এর সঙ্গে দ্বি-মত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি শেষের লাইনটি বাদ দিতে চাই। কারণ, যেসব দেশ এই ধরনের শ্লোগান দিয়ে এগিয়েছে, এখন তারা ‘বৃদ্ধের রাষ্ট্র’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। তাদের তরুণ সমাজের দারুণ অভাব। তারা আবার তাদের শ্লোগান পরিবর্তন করে এক একটি পরিবার দুই-তিনটি সন্তান যেন নেয়, সেই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিছুদিন আগে দুইটি দেশ (জাপান ও চীন) সফর করে একই অবস্থা দেখেছি। তিনি বলেন, আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যার বিচারে পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র বাংলাদেশ, যেখানে সারা পৃথিবীর সোয়া দুই শতাংশেরও বেশি মানুষ বসবাস করে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের জনসংখ্যাকে অনেকে একটা বোঝা মনে করেন; কিন্তু আমি তা মনে করি না। আমি মনে করি, আমরা যদি আমাদের জনসংখ্যার জন্য সঠিকভাবে শিক্ষা-দীক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে তাদের দেশের জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা যায়। আর এটা হবে আমাদের জন্য একটা বিরাট অর্জন। শুধু তাই নয়, আমরা যখন বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানাই, তখন বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধার মাঝে একটি লাইন যুক্ত হয় সেটা হলো-কর্মক্ষম তরুণ সমাজ, কর্মী। তার মানে যারা তরুণ এবং কর্মক্ষম তাদের অভাব এখন বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে। অথচ সেই ধরনের ভালো কর্মী বাংলাদেশে পাওয়া যায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত মন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে শ্লোগানের শেষাংশ ‘এক সন্তানই ভাল’ এই বক্তব্য বাদ দিয়ে প্রচারণা চালান। অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী দুইটি সন্তানের পক্ষে মত দেন।
শিশু হাসপাতালের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক বিভাগে একটি করে পৃথক শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এরই অংশ হিসেবে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
নার্স সংকট নিরসনে প্রয়োজনে নীতিমালা শিথিল ও নিয়োগ বিধি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে তীব্র নার্স সংকট রয়েছে। এ সংকট নিরসনে প্রয়োজনে বয়স সীমার বিষয়টি শিথিল করে নার্স নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। নিয়োগ বিধি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দ্রুত নিরসনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন। নার্সদের উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে নার্সদের পড়াশুনা ডিপ্লোমা পর্যন্ত ছিল। এখন সরকার নার্সদের জন্য ব্যাচেলর ডিগ্রির ব্যবস্থা করেছে। তাদের মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিকভাবে দেশের স্বনির্ভরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে আমরা এখন যথেষ্ট আত্মনির্ভরশীল। এখন খাবারের জন্য হাহাকার নেই। এখন দরকার পুষ্টি। সবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন সুষম খাদ্য গ্রহণে মানুষকে সচেতন করে তুলতে প্রচার চালানোর জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশে স্বাস্থ্য সেবা খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সারাদেশে দরিদ্র মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মন্ত্রী বলেন, দেশে দরিদ্র মানুষের মধ্যে হেলথ কার্ড বিতরণের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে কোন অনিয়ম-দুর্নীতি প্রশ্রয় দেয়া হবে না।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রেস সচিব এ কে এম শামীম চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে নার্সিং সেবার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন সেবা পরিদপ্তরের পরিচালক তাসলিমা বেগম।
