রাজধানীতে চলতি বছরের প্রথম দুই মাস ছিল ছিনতাইহীন নগরী। পুলিশের তথ্যমতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নগরীর কোন থানায় ছিনতাই সংশ্লিষ্ট কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মার্চ থেকে শুরু হয় ছিনতাই। এ মাসে ঘটে ২৪টি ছিনতাইয়ের ঘটনা। তবে অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুর্বৃত্তরা ব্যবহার করে চাপাতি, চাকু ও ককটেল। কিন্তু এপ্রিল থেকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় বাড়তে থাকে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। এ মাসে ছিনতাই ঘটে ১৮টি। মে মাসে ২৪টি। আর জুন মাসের গত ১৯ দিনে ঘটেছে ১১টি ছিনতাইয়ের ঘটনা। এসময় ছিনতাইকারীদের গুলিতে একজন ব্যবসায়ীসহ দুইজন নিহত হয়েছে। প্রত্যেকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহূত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সাম্প্রতিক সময় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, সাম্প্রতিক সময় শুধু ছিনতাই নয়, খুনের ঘটনাগুলোতেও বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার।
তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন বন্ধ থাকার পর সীমান্ত এলাকা থেকে আবারও বিভিন্ন পথে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র। এসব অস্ত্র খুব অল্প টাকায় দুর্বৃত্তরা সংগ্রহ করতে পারছে। পাশাপাশি সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া বেশ কিছু পেশাদার ছিনতাইকারী জেলখানা থেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছে।
পুলিশের ঐ কর্মকর্তা নগরীতে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে পেশাদার অনেক দুর্বৃত্তরা তখন নানা কাজে ব্যস্ত থাকে (তাদের ব্যবহার করা হয়)। এখন রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই বলে এসব দুর্বৃত্ত ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছে।
পুলিশ ব্যর্থ কীনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ ব্যর্থ এমনটা বলা যাবে না। কারণ অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভাল। যে কয়টি ঘটনা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ ব্যাপারে মহানগর পুলিশ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত ছিনতাই ও অস্ত্রের ব্যবহার কমবে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) কৃষ্ণ পদ রায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও ছিনতাই তত্পরতা সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করে বলেন, ক্রাইমের (অপরাধ) একটা স্বাভাবিক গতি আছে। কখনও বাড়ে, কখনও কমে। তবে পুলিশ অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বম্ব স্কোয়াড টিমের প্রধান এডিসি ছানোয়ার হোসেন সাম্প্রতিক সময় ছিনতাইয়ের কাজে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এ নিয়ে আতংকিত হবার কিছু নেই। বেশ কিছু ছিনতাইকারী জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তারা আবার নতুন করে সংঘবদ্ধ হবার চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আশাকরি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাদেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য থেকে জানা যায়, গত জানুয়ারিতে রাজধানী থেকে উদ্ধার করে ১১টি পিস্তলসহ ৩১টি আগ্নেয়াস্ত্র। ফেব্রুয়ারিতে উদ্ধার ৮টি পিস্তলসহ ৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র। মার্চে ১৪টি পিস্তলসহ ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র। এপ্রিল মাসে উদ্ধার করা হয় ১১টি পিস্তলসহ ৩২টি আগ্নেয়াস্ত্র। মে মাসে উদ্ধার হয় ১০টি পিস্তলসহ ৩৭টি অস্ত্র। তবে জুন মাসের গত ১৯ দিনে অস্ত্র উদ্ধার মাত্র ৮টি।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, গত ১৭ জুন রাজধানীর মুগদা এলাকায় ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসায়ী রুবেল হককে গুলি করে নিয়ে যায় ৬ লাখ টাকা। এ ঘটনায় দোলোয়ার হোসেন নামে এক রিকশা চালকও আহত হয়। একই দিন শ্যামপুরের ধোলাইখাল এলাকায় দোকান মালিক জাকির হোসেনকে গুলি করে ছিনতাইকারীরা নিয়ে যায় ৫০ হাজার টাকা। গত ৮ জুন ধানমন্ডি এলাকায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের একজন কর্মচারীকে (মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে) দেখিয়ে ছিনতাইকারীরা নিয়ে যায় ২৬ লাখ টাকা। ৭ জুন রায়েরবাগে ছিনতাইকারীদের নিহত হন মোবাইল রিচার্জ দোকানের কর্মচারী রাসেল। ছিনতাইকারীরা তার কাছ থেকে নিয়ে যায় ২১ হাজার টাকা। ৫ জুন রামপুরায় বিকাশ এজেন্ট কাজী রমজান আহত হন ছিনতাইকারীদের গুলিতে। তার কাছ থেকে নিয়ে যায় ৪ লাখ টাকা। ২৮ মে গুলিস্তান এলাকায় গুলি করে ও ককটেল ফাটিয়ে ছিনতাইকারীরা ফল ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের কাছ থেকে নিয়ে যায় ৩ লাখ টাকা। ১৯ মে খিলগাঁও এলাকায় ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জহির আহমেদ। ছিনতাইকারীরা তার কাছ থেকে কেড়ে নেয় ৭ লাখ টাকা। ২০ মে দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় ছিনতাইকারীদের গুলিতে আহত হন বিকাশ এজেন্ট সানাউল্লাহ। তার কাছ থেকে নিয়ে যায় ৭ লাখ টাকা। ১৪ মে দয়াগঞ্জ এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন কাঁচামাল ব্যবসায়ী এনামুল হক। একই দিন রামপুরায় ছুরিকাঘাত করে ছিনতাইকারীরা নিয়ে যায় দেড় লাখ টাকা। ছিনতাইকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও জানা যায়, গত ১২ মে পল্লবীতে চাঁদাবাজদের গুলিতে আহত হন শিপন নামে এক বেকারী দোকান কর্মচারী। ১৮ মে হাতিরঝিল এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় পুলিশ গুলিসহ এক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। ২২ মে পূর্ব রামপুরার বৌবাজার এলাকায় চাঁদাবাজদের গুলিতে আহত হন দোকান কর্মচারী রুবেল। একই দিন মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় দিনদুপুরে বাসায় ঢুকে অস্ত্রের মুখে দুর্বৃত্তরা স্বর্ণালংকারসহ কয়েক লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়।
