সেই ১৯৬২ সালে বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছিল চিলি। তারপর থেকে গত বিশ্বকাপসহ দু’বার দ্বিতীয় পর্বে যেতে পেরেছে তারা, বেশিরভাগ বিশ্বকাপে বাছাইপর্ব পার হয়ে আসাই হয়নি। এমন দলের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু আশা করা কঠিন ছিল। তারপরও দলটিকে এবার ‘ডার্ক হর্স’ বলছিলেন অনেকে। চিলি এখনও নিজেদের সেরা ফলাফলকে স্পর্শ করতে পারেনি, পারবেই এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে স্পেনকে ২-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের নতুন সূর্যোদয়ের একটা ইঙ্গিত অন্তত দিয়ে রাখলো জর্জ সামপাওলির দল।
চিলির সমর্থকরা অবশ্য রিও ডি জেনেরিওতে যে উল্লাস, উন্মাদনা দেখাচ্ছেন; তাতে সন্দেহ হতে পারে, ইঙ্গিতক নয়, চূড়ান্ত সাফল্যই তারা পেয়ে গেছে।
স্পেনকে হারিয়ে চিলির দর্শকরা সারারাত ধরেই করলেন বিশ্বজয়ের আনন্দ। রিও ডি জেনেরিওর কোপাকাবানার সৈকতে বুধবার সারারাত জেগে রইলেন তারা। ‘চি চি চি লে লে লে চিলি’—এমন শ্লোগান তুলে পুরো এলাকা গরম করে ফেলেছেন। লাল জার্সি গায়ে সবাই নাচ গান করছিলেন। চিলি থেকে গাড়িতে করে এসেছেন হাজার হাজার দর্শক। তারা রাস্তায় ঘুমাচ্ছেন কেউ কেউ। খাওয়া দাওয়া সেখানেই। সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে নারী-পুরুষরা আনন্দে মেতে উঠেছেন। সেই সুযোগে রাতভর বেচাকেনা করেছেন দোকানিরা।
৬৪ বছরের অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে চিলির। এই মারাকানার মাঠেই ১৯৫০ ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেন ২-০ গোলে চিলিকে হারিয়ে যে আনন্দ করেছিল। এবার সেটাই করছেন চিলির দর্শকরা। ৬২ বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক চিলি নিজেদের ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে তৃতীয় হয়েছিল। এরপর আর ভালো কোনো সাফল্য নেই দলটির। বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকদের কাছে চিলি একটি পরিচিত নাম। ৯০ ইতালি বিশ্বকাপ ফুটবলে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে চিলি। ফুটবলে চিলির আছে নানা রেকর্ড। আছে আর্জেন্টিনাকে হারানোর অভিজ্ঞতা। কোপা আমেরিকা ফুটবল টুর্নামেন্টে আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা চিলি।
ফুটবলার মার্সেলো সালাস, ইভান জামারানো, লায়নেল সানেচেজের মতো অনেক খেলোয়াড় উপহার দিয়েছে চিলি। ঐতিহ্যবাহী এই ফুটবল দেশটি নানা কারণে বিশ্ব ফুটবলের আলো থেকে সরে গিয়েছিল। ২০০৭ সালে শৃৃংখলার ভঙ্গের কারণে সাসপেন্ড কারা হয়েছিল সাত ফুটবলারকে। বলা হয়েছিল এদের কাউকেই কখনো জাতীয় দলের অধিনায়ক করা হবে না। চিলির ফুটবলটা যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। চিলির সমর্থকরা বলছেন, আমরা ফুটবলে নতুন করে জেগে উঠছি। চিলির বিখ্যাত ফুটবলার জামারানো মারাকানার মাঠে ছিলেন। প্রেসবক্সের পেছনেই রেডিওতে ধারাবিবরণীতে বিশেষজ্ঞ মতামত এসে বললেন, ‘আমরা এটা নতুন অভিযান শুরু করেছি। একটা নতুন সময় শুরু হচ্ছে।’
৯৪ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ, ৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপ, ২০০২ জাপান কোরিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বেই উঠতে পারেনি চিলি। আর ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্বই পার করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইন মার্সেলো বিয়েলসাকে দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। ২০১০ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে চিলি আর্জেন্টিনাকে হারায়। সেদিনের চিলির খেলা দেখে চিলির সমর্থকরা তো অভিবাদন জানিয়েছে সাথে আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও। এবারে বিশ্বকাপ ফুটবলে চিলির দায়িত্ব পালন করছেন বিয়েলসা। বলা হয় চিলির এই সাফল্যের পেছনের বড় কারিগার আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসা।
বিয়েলসার পথ ধরে এবার বিশ্বকাপে চিলিকে নিয়ে এসেছেন আরেক আর্জেন্টাইন সামপাওলি। স্পেনকে বিদায় করে দিয়ে গ্রুপ পর্ব নিশ্চিত করে ফেলার পর এই কোচ বলছিলেন, ‘স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে এই পারফরম্যান্স দেখানোয় আমি খুবই খুশি। আমরা খুবই গতিশীল ফুটবল খেলেছি, খুব সাহসের সঙ্গে খেলেছি। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী একটি দলকে হারিয়েছি। আমি দলের সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই দিনটা আমি কখনোই ভুলবো না।’
