ইংরেজী নাম : Lychee, laichi বা lichu।
স্থানীয় নাম : লিচু
বৈজ্ঞানিক নাম: Litchi chinensis
লিচু একটি নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের সুস্বাদু রসালো ফল। এ ফলটি সুস্বাদু ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর আদি নিবাস চীনে। বর্তমানে বিশ্বের বহু স্থানে লিচু চাষ করা হয়। বর্তমানে লিচু উত্পাদনকারী দেশসমূহের মধ্যে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানের দক্ষিণাংশ, ফরমোজা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রাজিল, বার্মা, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্লোরিডা, হাওয়াই, ভারত, বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ফল বাংলাদেশের সব স্থানেই কিছু না কিছু হয়ে থাকে। তবে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের লিচু প্রসিদ্ধ। এই এলাকার মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু আকারে বেশ বড় হয় এবং আকার ও সুস্বাদের জন্য বিশেষ জনপ্রিয়।
উদ্ভিদতত্ত্ব
লিচু গাছ চিরসবুজ, বহুবর্ষী, মাঝারি থেকে বড় আকারের ছত্রাকৃতির বৃক্ষ। এর কান্ড নাতিদীর্ঘ, শাখায়িত, অমসৃন ও ধুসর বর্ণের। বীজ থেকে উত্পাদিত গাছ ১২-১৫ মিটার লম্বা হয়। এ বৃক্ষের পাতা পক্ষল, যৌগিক এবং প্রতিটি পাতায় ৫-৭ টি অনুপত্র থাকে। পাতা পত্রাক্ষের দুই পাশে পরস্পর মুখোমুখিভাবে বিন্যস্ত থাকে। ফুল অত্যন্ত ছোট এবং সবুজে হলদে মিশানো, মসৃণ ও বর্শাফলাকৃতির। পুষ্পমঞ্জুরী - যৌগিক রেসিম। ফল রসালো , ২.৫-৩.৫ সে.মি. চওড়া বিশিষ্ট গোলাকার বা লম্বাকার। পাকা ফলের রঙ লালচে।
ফল
গ্রীষ্মের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফল লিচু। গন্ধ, রস ও স্বাদের মাধুর্য্যে লিচু দেশ-বিদেশে সমান জনপ্রিয়। লিচুর শাঁস নরম ( এরিল) সাদা, রসালো এবং সাধারণত মিল্ট। আমাদের দেশে লিচু তাজা অবস্থায় ফল হিসেবে খাওয়া হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে লিচু গাছে ফল আসে এবং মে মাস থেকে ফল বাজারে পাওয়া যায়। এ সময় বোটার সঙ্গে কিছু পাতাসহ ছোট ডাল ভেঙে ফল সংগ্রহ করতে হয়। সাধারণত ২০/৩০ বছর বয়স পর্যন্ত লিচু গাছে ফলন দিয়ে থাকে। প্রতিটি গাছ থেকে বছরে ১৫০-২০০ কেজি বা ৪২০০-
৭০০০ টি লিচু পাওয়া যায়। অবস্থাভেদে এর তারতম্যও হয়ে থাকে।
লিচু গাছের বংশ বিস্তার
লিছু গাচের বংশ বিস্তার দুইভাবে করা যায়- বীজ ও কলমের সাহায্যে। বীজের গাছে ফুল আসতে ৮ থেকে ১০ বছর লাগে। কলমের গাছে রোপনের পরের বছরের মধ্যেই ফল ধরতে আরম্ভ করলেও ভালো ফলন পেতে ৭ থেকে ৮ বছর সময় লাগে। প্রায় ২০-৩০ বছর পর্যন্ত লিচু গাছ থেকে ফলন ভালো পাওয়া যায়। বাংলাদেশে উন্নত লিচুর জাতের মধ্যে চায়না ৩, বোম্বাই লিচু, মোজাফ্ফরপুরী লিচু, মঙ্গলবারী লিচু, বারি লিচু ১, বারি লিচু ২, বারি লিচু ৩, বেদানা লিচু, এলাচ লিচু অন্যতম।
গাছ থেকে লিচু সংগ্রহের পর লিচুকে সাধারণত ২-৩ দিনের বেশি ঘরে রাখা যায় না। কেননা, এতে লিচুর খোসা লাল ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে বাদামি বর্ণ ধারণ করে এবং বাজারমূল্য কমে যায়। তবে ২.২-২.৩০ সে. তাপমাত্রায় ৮০-৮৪% আর্দ্রতায় লিচুকে একমাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। তাজা ফল রেফ্রিজারেটরে ৫-৭ দিন রেখে খাওয়া যায়। এ ছাড়া লিচুকে রোদে খুব ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
লিচুর পুষ্টি উপাদান
প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে শক্তি রয়েছে ২৭৬ কিলোজুল, কার্বোহাইড্রেট ০৬.৫ গ্রাম, ডায়াটারি ফাইবার ১.৩ গ্রাম. প্রোটিন ০.৪ গ্রাম, ভিটামিন সি ৭২ মি. গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৫ মি. গ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১০ মি. গ্রাম, ফসফরাস ৩১ মি. গ্রাম. পটাসিয়াম ১৭০ মি. গ্রাম ও সোডিয়াম ৩ মি. গ্রাম।
পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল হিসেবে লিচুর জুঁড়ি নেই। মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান হিসেবে লিচুতে রয়েছে পরিসৃত ফ্যাট ও খুবই কম পরিমান সোডিয়ামের। এ ফলটিতে কোনো ক্লোলেস্টরেল নেই। লিচুতে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি বিদ্যমান। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন ভিটামিন সি-এর চাহিদা পূরণে নয়টি লিচুই যথেষ্ট।
রোগ প্রতিরোধে লিচু
লিচুতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অলিবল রয়েছে যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস উপর অত্যন্ত কার্যকর। এটি রক্তের প্রবাহ সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে সাহায্য করে ও সূর্যের ক্ষতিকারক অতি বেগুনী রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে সুরক্ষা করে। লিচুতে বিদ্যমান ভিটামিন সি-মানবদেহে ক্ষতিকর জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। লিচুতে যথেষ্ট খনিজপদার্থ যেমন পটাসিয়াম ও কপার পাওয়া যায়। পটাসিয়াম শরীরের কোষ, রক্তপ্রবাহ, হাটরেট নিয়ন্ত্রণ ও ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এটা করোনারি হার্টের অসুখ ও স্ট্রোকের প্রতিরোধ করে। শরীরে রক্ত লোহিত কণিকা গঠনে কপার সহায়তা করে।
লিচু গাছ ও লিচুর ব্যবহার
চীনদেশে লিচু গাছ ভেষজ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এ গাছের শিকড়, বাকল ও ফুল সিদ্ধ জল গলার ঘা ভাল হয়। কচি লিচু শিশুদের বসন্তরোগ এবং বীজ অম্ল ও স্নায়ুবিক যন্ত্রণার ওষুধ হিসেবে ব্যবহূত হয়। অনেক দেশে লিচুর মোরব্বা তৈরি করে চিনির রসে সামান্য সাইট্রিক এসিড দিয়ে শাসগুলি ডুবিয়ে টিনের কৌটায় আবদ্ধ করা হয়। লিচু ক্ঠ অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির হওয়ায় এ গাছের কাঠ গৃহ নির্মাণে ব্যবহার করা হয়।
