অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৫ জুন ২০১৪ জাতীয় সংসদে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে মোট আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৬ শতাংশ। এবারের বাজেটে ধরা মোট আয়ের (১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা) সবচেয়ে বেশি পূরণ করা হবে রাজস্ব খাত থেকে। এবারের রাজস্ব আয় মোটামুটি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়করনির্ভর।
বাজেটে ভ্যাট ও করের জাল বিস্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে। আবার নতুন অনেক খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে। বেশ কিছু সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে এসব খাতের সেবার মূল্য অনেক বেড়ে যাবে যা মানুষের জন্য এক ধরনের দায় হিসাবে আবির্ভূত হবে। এর মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চ, বাস, রেল সার্ভিসের উপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ মূসক বাতিল করে ১৫ শতাংশ মূসক কার্যকর করা হচ্ছে। এতে এসব সেবার দামও বেড়ে যাবে। এছাড়াও কতিপয় সেবা যেমন মোটর গাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ ডকইয়ার্ড, ছবি নির্মাতা, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল, ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা, পরিবহন ঠিকাদার— এসব ক্ষেত্রে ভ্যাট সাড়ে ৪ শতাংশের স্থলে ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে আগের কর বাতিল করে নির্ধারিত কর থেকে আরও বাড়ানো হয়েছে। এরফলে চিনিসহ অনেক পণ্যের দাম বাড়বে।
বাজেটে করের আওতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। উপজেলা, জেলাপর্যায়ে এবার করের আওতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। চড়া মূল্যস্ফীতির পরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে করের সীমা বাড়ানো হয়েছে। বাড়ির মালিকদের তস্য ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া আদায়ের বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। ব্যাংকে জমা বাড়ি ভাড়া থেকেই সরকার আনুপাতিকহারে কর কেটে রাখবে। এতে বেড়ে যাবে বাড়িভাড়া।
এবার আমদানি পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সম্পূরক শুল্ক তুলে নেয়া হচ্ছে। ফলে দেশি শিল্প তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বৈদেশিক অনুদান ছাড়া সামগ্রিক বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ।
অনুদানসহ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। এ ঘাটতি ব্যাংক ঋণ, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থে মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উেসর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া হবে ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
এই বাজেটে সম্পদ আহরণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোন সমন্বয় রাখা হয়নি। বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে দু’টি বিষয় বিবেচনায় আসে। প্রথমত যে আকার নির্ধারণ করা হয়েছে তার অর্থ সংগ্রহ সম্ভবপর কিনা। অর্থায়নের সূত্রগুলোর বিভাজন বাজেটে দেয়া থাকবে। অর্থায়নের বড় উত্স রাজস্ব। বাজেটে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এটি অর্জন একটি অলীক কল্পনা মাত্র অর্থায়নের আর একটি উত্স বৈদেশিক সহায়তা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। বিগত সময়গুলোতে বৈদেশিক সহায়তা সর্বোচ্চ এসেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে নিশ্চিতভাবেই তাই ঘাটতি দেখা দিবে। সরকার ব্যাংক ঋণ বেশি নিলে সুদের হার বাড়বে এবং প্রাইভেট খাতে ঋণ প্রবাহ কমবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। প্রবৃদ্ধি ৭.৩ ধরা হলেও তা কোনভাবেই অর্জন সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত বাজেট বিভিন্ন খাতে যে
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে
শিল্পঃ প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য আশানুরূপ কিছু নেই। শিল্পে বিনিয়োগ উত্সাহিত করারও পদক্ষেপ নেই। স্থানীয় শিল্প সংরক্ষণে এতদিন যে প্রটেকশন ছিল তা বদলে আমদানিকৃত বহু পণ্যে সম্পূরক শুল্ক কমানো হয়েছে। এতে স্থানীয় শিল্প বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া স্থানীয় শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুত্, গ্যাস পাওয়ারও কোন নিশ্চয়তা বা প্রতিশ্রুতি নেই। প্রস্তাবনা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের ট্যারিফ মূল্য বাড়ছে। এতে শিল্পের উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। কিন্তু সে অনুসারে পণ্য মূল্য পাবে না। পরিবেশ রক্ষায় নামে সব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইকোট্যাক্স আরোপ করা হচ্ছে যা শিল্প উদ্যোক্তাদের নিরুত্সাহিত করবে। ব্যাংকের সুদের বর্তমান যে হার রয়েছে তাতে শিল্প রক্ষা তো দূরের কথা পুঁজিও রক্ষা হবে না। এই বাজেটে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়বে।
কৃষিঃ প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি না বাড়ার কারণে কৃষকের উত্পাদন খরচ বাড়বে। ইতিমধ্যে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। ফলে বেড়েছে সেচ খরচ। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে সার উত্পাদন খরচও বাড়ছে। সার ও সেচের খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষকের পণ্য উত্পাদন খরচ বাড়বে। এদিকে বাজেটে জ্বালানি তেলের ট্যারিফ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে। যার ফলে জ্বালানি মূল্য আরেকদফা বাড়বে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি কৃষককে আঘাত করবে। অপরদিকে ভর্তুকি বৃদ্ধি না পাওয়ায় উত্পাদন খরচের বেশির ভাগ বোঝা সাধারণ কৃষককে বহন করতে হবে।
কর্মসংস্থানঃ বিনিয়োগে বড় ধরনের দিক নির্দেশনা না থাকায় কর্মসংস্থান বাড়বে না। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নেই কোন প্রত্যাশার দিক নির্দেশনা। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ করমুক্ত এবং স্টক এক্সচেঞ্জকে ৫ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর ফলে স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকরা লাভবান হবেন কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর ইতিবাচক কোন প্রভাব পড়বে না।
মজার ব্যাপার হলো দাম বাড়ানো এবং কমানো পণ্যের তালিকা বদল করে দিলে দেশের সাধারণ মানুষের উপকার হতো।
লেখক: আইনজীবী
দাম কমবে
কোক, কাপড়ের রং, ব্রাশ, ইমিটেশন জুয়েলারী, অমসৃণ হীরা, প্রসাধন সামগ্রী, চকলেট, পটেটো চিপস, সুগন্ধী প্রসাধনী ইত্যাদি।
দাম বাড়বে
জ্বালানি তেল, মোবাইল ফোন, স্বর্ণ, বোতলজাত পানি, এন্টিবায়োটিক ওষুধ, রড, এনার্জি সেভিং বাল্ব, গ্যাস সিলিন্ডার, মোটরসাইকেল, সার্জিক্যাল গ্লোভস, বাইসাইকেলের টিউব, টায়ার, ট্রেন সার্ভিস ইত্যাদি।
