সরকারি কাজে লাভের পরিমাণ অনেক এবং কাজ মানসম্পন্ন না হলেও সমস্যা নেই—এমন ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। লাখ কিংবা কোটি টাকার অঙ্কের কেনাকাটা বা নির্মাণ প্রকল্প, সরকারের সংশ্লিষ্টতা যেখানে, মধুচক্র সেখানেই হানা দেয়। বিষয়টি সরকারের জন্যও উদ্বেগের। বিভিন্ন দেশ ও আর্থিক সংস্থা বাংলাদেশকে নিয়মিত উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করে থাকে। তাদের দিক থেকেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার তাগিদ নানা সময়ে প্রকাশ পায়। মূলত তাদের তাগিদেই দরপত্র পেশের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া চলছে।
কে কাজ পাবে, কীভাবে পাবে এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা ইত্যাদি বিষয়কে তাদের দিক থেকে ঋণ-অনুদানের শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। ই-টেন্ডার চালুর ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ যথেষ্ট। সড়কসহ যে কোনো অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবাখাতের কাজের ই-টেন্ডার করা না হলে দাতা সংস্থার অর্থ মিলবে না, এমন চাপও দেওয়া হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে ই-টেন্ডারকে এখন সরকার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবেই ধরে নেওয়া চলে। এ ক্ষেত্রে যত সফলতা আসবে, সরকারের ব্যয় থেকে তত বেশি সুফল মিলবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে বলে যে দেশ-বিদেশে বদনাম, সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্যও এর প্রয়োজন অপরিসীম। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহলের যত আন্তরিকতাই থাকুক না কেন, প্রক্রিয়াটি ভেস্তে দেওয়ার মহলও যথেষ্ট সক্রিয়।
দরপত্রের নামে পেশিশক্তির প্রদর্শন, সংঘর্ষ আর দলীয়করণের ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসতে ইতিমধ্যে চালু করা হয়েছে ইলেকট্রনিক টেন্ডারিং বা ই-টেন্ডার। এর ফলে সরকারি কাজের দরপত্রদাতাদের সংশ্লিষ্ট অফিসে উপস্থিত হয়ে দরপত্র দাখিলের প্রয়োজন হবে না। ই-মেইলের মাধ্যমে দরপত্র দাখিল করতে পারবেন আগ্রহী দরপত্রদাতারা। দেশে তো বটেই বিদেশ থেকেও কেউ ইচ্ছা করলে দরপত্রে অংশ নিতে পারবেন।
ইতিমধ্যে সরকারি দরপত্রের ক্ষেত্রে ই-টেন্ডার আংশিকভাবে চালু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ই-টেন্ডার চালু হওয়ায় দরপত্র দাখিলের নামে পেশিশক্তির প্রদর্শন বন্ধ হবে। প্রতিযোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দরপত্র থেকে দূরে রাখার প্রক্রিয়ায় বাদ সাধবে ই-টেন্ডার পদ্ধতি। দরপত্রে অংশ নিতে ইচ্ছুক সব দরপত্রদাতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে প্রতিটি সরকারি কাজ প্রতিযোগিতামূলক দামে করা সম্ভব হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমানে রাজনৈতিক ক্যাডার ও পেশাদার সন্ত্রাসীদের যে দাপট রয়েছে তার অবসান হবে। সরকারি দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ব্যবহার করে সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে।
তবে কথায় বলে দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। স্বার্থবুদ্ধি সবকিছুর উপরে যখন স্থান পায়, তখন কু-যুক্তির অভাব হয় না। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি মহলের তত্পরতায় সরকারের অর্থের অপচয় করা হয়। পছন্দের লোক কিংবা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে গিয়ে নানা অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রয়োজনে পেশিশক্তি প্রয়োগ করা হয়। এতে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়।
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, সরকারের ৮টি মন্ত্রণালয়ের ২৯টি সংস্থায় ইতিমধ্যে ই-টেন্ডার চালু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের সব সরকারি টেন্ডারকে এ প্রযুক্তির আওতায় আনা যাবে। এর ফলে সরকারি উন্নয়ন কাজে যেমন স্বচ্ছতা আসবে, তেমন সমাজে মাস্তান ও সন্ত্রাসীদের দাপটও কমে আসবে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের ঘাড়ে চেপে সরকারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার পদ্ধতির অবসান হলে জনমনে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী সম্পর্কে যে বিরূপ ধারণা গড়ে উঠেছে তার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে।
আশা করবো, সর্বস্তরে ই-টেন্ডার চালুর ক্ষেত্রে সরকার আরো তত্পর হবে। সরকারি কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রেও ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির সমপ্রসারণ ঘটাতে হবে। গোপনে টেন্ডার আহ্বান করে বিশেষ ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার যে কারচুপি প্রায়ই চলে তার অবসান ঘটাতে টেন্ডার আহ্বানে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
ঢাকা
