ক্রিকেটের কাছে ফুটবল তার সেই পুরনো জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের ক্রিড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় দুটি খেলার সামপ্রতিক অবস্থাটা এমনই। অথচ, চার বছর পর পর এক মাসের জন্য হঠাত্ করেই যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। সারা বছর সাকিব আল হাসান-তামিম ইকবালদের রান বলের হিসাব কষা দেশের মানুষগুলো হঠাত্ করেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়েন কোন এক জাদুতে।
নেইমার-লিওনেল মেসি-ক্রিশিয়ানো রোনালদো নামের জাদুকররা বিশ্বকাপ মঞ্চে কি জাদু দেখাচ্ছেন সে নিয়ে আলোচনায় রাত কেটে ভোর হয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের এই উন্মাদনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশের ফুটবলের অতীত ঐতিহ্য আর জনপ্রিয়তার কথাও। এখন যে ফুটবল উন্মাদনা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় চার বছর, একসময় নিয়মিতই তার দেখা মিলতো সারা দেশ জুড়েই।
বিশ্বকাপের এই সময়টাতে এখন যেসব বাসা বাড়িতে উড়ছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা, তখন হয়তো সেখানে আবাহনী-মোহামেডানের পতাকা উড়তো না। তবে, আজ বিকেলের ম্যাচে মোহামেডান কেমন খেলেছে কিংবা কাজী সালাউদ্দিন গোল পেয়েছেন কিনা সেই আলোচনাটা অন্তত চলতো প্রতিনিয়তই।
আর আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ হলে তো কথাই নেই। ম্যাচের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে তুমুল বিতর্ক। টিকেটের জন্য দীর্ঘ লাইন, স্টেডিয়ামমুখী মানুষের দীর্ঘ সারি। আর, ম্যাচের সময় সেই জমায়েতটা স্টেডিয়াম চত্বর ছাড়িয়ে চলে আসতো পল্টন কিংবা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পর্যন্ত।
এই ফুটবল উন্মাদনা কখনো কখনো মাত্রা ছাড়িয়ে পরিণত হত উন্মত্ততায়ও। খেলার সময় দুই দলের সমর্থক তো বটেই খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের মধ্যে হাতাহাতি মারামারির ঘটনাও বিরল নয় মোটেই। ফুটবল উন্মাদনাকে কেন্দ করে এই বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামেই মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে।
ফুটবলারদের দল বদলের সময় ক্লাবপাড়ায় যে উত্তেজনা বিরাজ করতো সেটাকে আপনি চাইলে মেলাতে পারেন বিয়েবাড়ির উত্তেজনার সঙ্গে। বিয়ের দিন যে উত্তেজনা নিয়ে কনেপক্ষ অপেক্ষা করতো বরপক্ষের জন্য, পছন্দের ফুটবলারদের বরণ করে নিতে ক্লাব সমর্থকদের উত্তেজনার মাত্রাটা তার চাইতে মোটেই কম ছিল না। বিয়েবাড়ির মতোই সাজ সাজ রব পড়ে যেত পুরো ক্লাবপাড়ায়। ঢোল, ব্যান্ড পার্টি, বাদ্য বাজনা আর ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে আয়োজনে প্রিয় তারকাদের নিয়ে আনন্দ-উত্সব কখনো কখনো চলতো পুরো সপ্তাহজুড়েই।
পছন্দের তারকাকে দলে ভেড়াতে ক্লাব কর্তৃপক্ষের প্রতি সমর্থকদের দারুণ চাপ থাকতো সবসময়ই। সমর্থকদের সেই চাপ মেটাতে ক্লাবগুলোও চাইতো প্রয়োজনে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে হলেও পছন্দের খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াতে। ক্রিকেটের এই জয়জয়াকারের দিনেও এক মৌসুমে কোন ক্রিড়াবিদের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের রেকর্ড বহু বছর ধরেই ছিল মোনেম মুন্নার দখলে। মাত্র কয়েক বছর আগে জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ভাঙ্গেন সেই রেকর্ড।
এমন নজিরও বিরল নয়, কাঙ্খিত ফুটবলাররা যেন অন্য কোন দলে যেতে না পারেন সেজন্য তাদের কয়েকদিনের জন্য আটকেও রাখা হতো! সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটাকে বাড়াবাড়িই মনে হতে পারে, তবে একই সাথে এটা স্মরণ করিয়ে দেয় ফুটবল নিয়ে ক্লাবগুলোর ভালবাসার তীব্রতার ব্যাপারটাও।
কাজী সালাউদ্দিন, জাকারিয়া পিন্টুদের সেই পুরনো সময় থেকে শুরু করে সালাম মুর্শেদী, কায়সার হামিদ-মোনেম মুন্নাদের সময়েও ঢাকার ফুটবলের ছবিটা ছিল এমনই জ্বলজ্বলে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে কথাটা খানিকটা গল্পের মতো শোনালেও তখনকার বাস্তবতা ছিল এটাই। ঢাকার ফুটবলের জনপ্রিয়তা তখন এতটাই বেশি ছিল যে পশ্চিমবঙ্গের ক্লাবগুলো হন্যে হয়ে ঘুরতো ঢাকাই ফুটবলারদের পেছনে। কলকাতায় মোনেম মুন্না এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলতে যখন তিনি কলকাতায় যেতেন, ভক্তদের ভীড় এড়াতে বিমানবন্দর থেকে তাকে বের করা হত পুলিশ প্রহরায়।
ঘরোয়া ফুটবলের এই স্বর্ণযুগের কথা ভেবে এখনো স্মৃতিকাতর হন তাই সাবেক ফুটবলাররা। কৃতী ফুটবলার এবং বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সিনিয়র সহ সভাপতি সালাম মুর্শেদী পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘কি জমজমাটই না ছিল তখন ক্লাবপাড়া। ম্যাচ তো অবশ্যই, অনুশীলনেও থাকতো ভক্তদের ভীড়। প্রিয় তারকাদের পায়ের জাদু দেখতে মুখিয়ে থাকতেন তারা। খেলোয়াড়দের দায়বদ্ধতাও ছিল তেমনই। ফুটবলকে কেবল একটা খেলা ভাবতেন না তারা, ভাবতেন জীবনেরই একটা অংশ বলে। খেলোয়াড়রাও তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করতেন সমর্থকদের প্রত্যাশার এই দায়ভার মেটাতে।’
অথচ, নব্বই দশকের শুরুর দিকে হঠাত্ করেই যেন থমকে গেল ফুটবল। একসময় জনপ্রিয়তায় এতটাই ভাটা পড়লো যে, মানুষ ভুলেই যেতে বসলো পুরনো সেই দিনগুলোর কথা। ফুটবলের এই দর্শকপ্রিয়তা হারানোর পেছনে খেলোয়াড়দের নিবেদনের অভাবকেই অনেকাংশে দায়ী করলেন সালাম মুর্শেদী। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের অধিকারী এই তারকা বলেন, ‘আগে খেলোয়াড়দের মধ্যে দায়বদ্ধতার যে জায়গাটা ছিল এখন সেটা নেই। বর্তমান খেলোয়াড়দের প্রতিভার হয়তো কমতি নেই, কিন্তু মাঠে সেই প্রতিভার স্বার্থক অনুবাদ করতে যে নিবেদন প্রয়োজন সেটার অভাব আছে। খেলোয়াড়রা এখন অনেক বেশি পেশাদার। তারা বোঝেন কি করলে পেশাগতভাবে আরো ভাল করা সম্ভব। কিন্তু, কি করলে মাঠে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করা যায়, সে নিয়ে তারা কতটুকু চিন্তা করেন আমি জানি না। মাঠে যদি ভাল খেলা না হয়, তাহলে দর্শক কেন আসবে?’
সালাম মুর্শেদীর ঠিক উল্টো পথে হাঁটলেন দেশসেরা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলি। খেলোয়াড়দের নিবেদনের ঘাটতি নয় বরং প্রচারণার অভাবকে দায়ী করলেন তিনি। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রচারণা চালানো হচ্ছে না বলেই মানুষ দিন দিন ফুটবল বিমুখ হচ্ছে দাবী করে দেশসেরা এই স্ট্রাইকার বলেন, ‘এই যে এখন বিশ্বকাপ চলছে। এই সময়টাতে আপনি যদি লিগ চালান, তাহলে কে যাবে সেই খেলা দেখতে? এই সময়টাতে সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলোও ঘরোয়া ফুটবলের সংবাদ ততটা প্রকাশ করতে পারবে না। রাত জেগে খেলা দেখা আবার দিনের বেলায় খেলাটা দারুণ কঠিন।’
তবে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আরেকবার এদেশের মানুষের ফুটবল উন্মাদনা দেখে বেশ আশাবাদী বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ। ফুটবল নিয়ে এই উন্মাদনাটা আবারো বাংলাদেশের মানুষ নিয়মিত দেখতে পাবে বলে আশাবাদী তিনি। ‘কোন জিনিস একবার শেষ হয়ে সেটাকে আবার আগের রূপে ফিরিয়ে আনাটা বেশ কঠিন। তবে আমরা চেষ্টার ত্রুটি রাখছি না। কিছুটা হয়তো সময় লাগবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে ফুটবলকে আবারো দেশের জনপ্রিয়তম খেলায় পরিণত করা সম্ভব।’
আমরা বরং এখন তার জন্যই প্রার্থনা করি!
