পৃথিবীর যেখানে যাই হোক, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই যেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। জার্মানি, ইটালি, ফ্রান্সের সমর্থক থাকলেও ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার প্রতি এদেশের ফুটবল পাগল মানুষের আবেগ অনেক বেশি। ফলে বাংলাদেশের সাংবাদিকদেরও সব দলকে অগ্রাহ্য করে ছুটতে হচ্ছে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার পেছনে। এই দুই দল যেখানে যাচ্ছেন সেখানে পিছু নিয়েছেন সাংবাদিকরা। ইরানের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচ আজ বেলো হরিজোন্তেতে। এই যাত্রায় আক্ষরিক অর্থেই বোঝা গেল, কেন এই ব্রাজিল দেশটাকে ‘মহাদেশ’ বলে অনেকে মজা করেন। রিও ডি জেনেরিও থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে এই বেলো হরিজোন্তে। সাও পাওলোর তুলনায় রিওকে মনে হয়েছিল চকচকে শহর। বেলো হরিজেন্তোকে দেখে রিওকেও ‘সেকেলে’ মনে হল।
রিও ডি জেনেরিও থেকে যে পথটা বেলো হরিজোন্তে গেছে তার পুরোটাই পাহাড়ে পাহাড়ে। কখনো এক হাজার ফুট উপর দিয়ে, কখনো তিন হাজার ফুট উপর দিয়ে গেছে বাস। এই চড়াই-উত্রাই পার করা পথ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। বাসটি যখন কয়েক হাজার ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিল তখন হঠাত্ প্রচণ্ড বৃষ্টি। তারপরও বাসের গতি কমেনি। নির্ধারিত গতিতেই এগিয়ে চলছিল। গাড়ির ভেতরে তখন সবাই ঘুমিয়ে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা যায়, অনেক নিচে বাড়ি-ঘর।
সড়ক এতোটাই মসৃণ মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল বাস যেন ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে। এই পথের ডানে বায়ে শত শত পাহাড় চোখে পড়বে। পাহাড়ের কোলে মাটি কেটে নিরাপদ সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে সংযোগ সেতু। রয়েছে প্রচুর ফ্লাইওভার। পাহাড়ের বুক চিরে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যেতে হয়। মনে হয় পাহাড়গুলো আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে আছে। এসব পাহাড়েও রয়েছে মানুষের বসবাস। পাহাড়ের মধ্যে আধুনিক শহর গড়ার পরিকল্পনা চোখ খুললেই অনুভব করা যায়। পাহাড়ের উপরে প্লট তৈরি করে বিক্রি করা হয়। ভিআইপি সড়কের ন্যায় বড় বড় সুন্দর রাস্তাগুলো পাহাড় থেকে নিচে নেমে গেছে। লাইট পোস্টে জ্বলছে আলো। যেসব ব্রাজিলিয়ান আরো সুন্দর পরিবেশে বসবাস করতে চায় তাদের জন্যই নাকি এমন এসব আয়োজন। পাহাড়ের পাশে আছে জনবসতি। বন জঙ্গলের ভেতরে মানুষের বসবাস। গাড়ি না থাকলেও তার জন্য রাস্তা তৈরি আছে। যেখানে মানুষ নেই সেখানেও বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্গে আছে সৌর বিদ্যুত্ ব্যবস্থা। দূরে একটা ঘর থাকলেও তার জন্য বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়েছে। যে জঙ্গলে ঘর নেই সেখানেও বিদ্যুত্ সংযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড়ের গায়ে পাহাড়। অসাধারণ সব সুন্দর বাড়ি-ঘর, সবুজে ঘেরা পরিবেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে বসবাস।
ব্রাজিল বিশাল আকৃতির দেশ। এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে কোথাও একদিন লাগে, আবার কোথায় তিন দিন লেগে যায়, সড়ক পথে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উল্লেখ করা মতো একটা বিষয়। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠান পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে কেউ পাহাড় কেটে মাটি নিয়ে যায় না। গাছ কেটে বন উজাড় করে না। ব্যক্তি মালিকানা ও সরকারি উদ্যোগে চলছে উন্নয়ন কার্যক্রম। ভিলাভেলা নামে গড়ে উঠছে ছোট আধুনিক শহর।
রিও ডি জেনেরিও থেকে বেলো হরিজোন্ত পর্যন্ত ৫০০ কিলোমিটার সড়ক পথ পাড়ি দিতে কত ফুটবল মাঠ দেখা গেছে, তা বলা কঠিন। প্রত্যেকটি বাড়ির পাশেই ফুটবল খেলার মাঠ ও গোলপোস্ট রয়েছে। ফুটবল খেলার জন্য সব ব্যবস্থা আছে পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসকারীদের জন্য।
