বেসরকারি বিনিয়োগে দুর্বলতা অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল দিক

আপডেট : ২১ জুন ২০১৪, ২৩:০৪
বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্বলতাই বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক। আর এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার দেশে ব্যক্তি বিনিয়োগ ও বড় ধরনের উত্পাদন বৃদ্ধির উপর জোর দিচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে, সার্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামের (বিইএফ) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ কথা বলেন। প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয়ঃ ‘ভিশন ২০৩০: অর্থনৈতিক নীতি তৈরির কাঠামো এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের কৌশল প্রণয়ন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতির আরও সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধারাকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার দেশে ব্যক্তি বিনিয়োগ ও বড় ধরনের উত্পাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আমরা বিদ্যুত্ ও জনশক্তি উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি কাজ করছি, যা ব্যক্তি বিনিয়োগ ও উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। কারণ বিদ্যুত্ না থাকলে ব্যক্তি বিনিয়োগ বাড়বে না। আবার দক্ষ জনশক্তি না থাকলে বড় ধরনের উত্পাদনও সম্ভব না। অর্থনীতির দুর্বলতর দিক নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের জমির স্বল্পতা রয়েছে। বিশেষ করে বড় বড় কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যায় না। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধিও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় সমস্যা। যা আমাদের সমাধান করতে হবে। এরচেয়ে বড় সমস্যা রাজনৈতিক। তিনি বলেন, জমি ব্যবহারের পরিকল্পনায় জেলা ও উপজেলাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। যত্রতত্র বড় বড় স্থাপনা তৈরির ফলে আমরা কৃষিজমি হারাচ্ছি। তাই জেলা ও উপজেলাকে সম্পৃক্ত করে জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা খুবই প্রয়োজন। সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এ ঘটনা পুরো ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কোন আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি মহিউদ্দিন আলমগীরের সভাপতিত্বে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী, সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, বৃটেনের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল লিপটন, অর্থনীতিবিদ খলীকুজ্জমান আহমেদ, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফায়েকুজ্জামান প্রমুখ। উদ্বোধনী পর্বে সঞ্চালকের বক্তব্যে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে মতপার্থক্যা থাকতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে কোন প্রকার মতপার্থক্য থাকা উচিত নয়। অর্থনীতির উন্নয়নে সকলকে অংশগ্রহণ করা উচিত। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ দরকার কেননা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকারি বিনিয়োগের চেয়ে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বেশি উত্সাহিত করা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এ খাতই মূল ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসছে, এটি উন্নয়নের কাজে ব্যবহূত হতে পারতো। কিন্তু এ নিয়ে সুষ্ঠু কোন পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। রেমিট্যান্সের অর্থ উত্পাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ফিক্সড্ ক্যাপিটাল (রিজার্ভ) পর্যাপ্ত পরিমাণ রয়েছে, যা যেকোন দেশের শক্তি। বাংলাদেশে রিজার্ভ বাড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু এ ক্যাপিটাল কিভাবে ব্যবহার করতে হবে সে বিষয়ে কোন নীতি কিম্বা পরিকল্পনা নেই। এটি অর্থনীতিতে ক্ষতির কারণ। উদ্বোধনী পর্বের আলোচনায় সাসেক্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মাইকেল লিপটন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে খামার উত্পাদনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ভাল অগ্রগতি হয়েছে। বিগত কয়েক দশকে দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গ বৈষম্য কমিয়ে আনা, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ আশানুরূপ অগ্রগতি সাধন করেছে। তবে এখন বড় চ্যালেঞ্জ এই অগ্রগতির ধারা ধরে রাখা। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলা, গ্রামীণ উন্নয়নের ধীরগতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমি ক্ষয়, লবণাক্ততা বৃদ্ধিতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে অর্থনীতিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব। উল্লেখ্য, অর্থনীতিবিদের সমন্বয়ে সমপ্রতি ‘বাংলাদেশ ইকোনোমিস্টস ফোরাম’ নামে নতুন ফোরাম গঠিত হয়েছে। এ ফোরাম নিজেদের সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক দাবি করে দেশের পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। শনি ও রবিবার দুদিনের সম্মেলনে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের উন্নয়নের পক্ষে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরবে এ ফোরাম। গতকাল উদ্বোধনী পর্বে দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একবার পড়লে আর ওঠে না। এর কারণ এখনও আমাদের কাছে অস্পষ্ট। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সবাইকে এ কারণ খুঁজতে হবে। বাংলাদেশে এত রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংক প্রয়োজন নেই। সরকারি কাজ পরিচালনা করার জন্য শুধু সোনালী ব্যাংকই যথেষ্ট। আর অন্য ব্যাংকগুলোকে ধীরে ধীরে ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেয়া উচিত। এতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং হলমার্ক, ডেসটিনির মতো ঘটনা ঘটবে না। দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক শক্তিশালী। ১৯৯৭ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে একটি ‘গসিপ’ প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে কোনো সঠিক তথ্য উপাত্ত ছিল না। বাস্তবতার সাথে এর কোনো মিল নেই।