চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিষমুক্ত আম খেতে চাইলে কাঁচা আম কিনুন

আপডেট : ২১ জুন ২০১৪, ২৩:০৪
এবার ব্যবসায়ীসহ বাগান মালিক এবং ভোক্তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে আম কেনাবেচা করছেন। ভোক্তাদের আমের প্রতি ভক্তি আগের মত নাই। গাছ থেকে সদ্যপাড়া আম কিনতে গিয়েও জিজ্ঞেস করছেনঃ আমে কি ফরমালিন দিয়েছেন? উত্তর না হলেও আশংকা নিয়েই কাঁচা আম কিনছেন। পাকা আম নিয়ে বেশি ঝমেলা বেঁধেছে ভোক্তা ও ক্রেতার মধ্যে। অনেক সময় বিক্রেতা শপথ নিয়ে বলছেনঃ আমে ফরমালিন নাই। বিশেষ করে কাঁচা আমে। গাছ থেকে পাড়া কাঁচা আম পেড়ে কয়েকদিন বাড়িতে পাকিয়ে বাজারে কেনা বেচা হচ্ছে। এরা সাধরণত ক্ষুদ্র আম ব্যবসায়ী। তাদের কাছ থেকে কিনেই বাজারে ব্যবসায়ীরা কেনা বেচা করেন। এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানে গাছে মুকুল দেরিতে আসায় আমও দেরিতে পাকতে শুরু করে। দেশজ প্রথা অনুযায়ী আম ব্যবসায়ীরা জৈষ্ঠ্য মাসের শেষ পক্ষে আম চালানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। শুরু হয় আম চালানের তোড়জোড়। এই জেলায় ৩ ভাগে আম উত্পাদন হয়। আগাম, মধ্যম ও নাবী। পর্যায়ক্রম আম গাছে পাকে এবং বাজারে আমদানি হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাকানোর জন্য কেমিক্যালের প্রয়োজন হয় না। তবে অতি উত্সাহী একশ্রেণীর ব্যবসায়ী অপক্ক আগাম ও গুটি জাতের আম কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বদনাম কুড়ান। আম পাকার একটি লক্ষণ- আমের আঁটি শক্ত হলে গাছেই আম পাকতে শুরু করে। কতিপয় লোভী ব্যবসায়ীর কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি আমের ব্যবসা নিয়ে শংকিত আম বাগান মালিক এবং সর্বপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। আমগাছে রোগবালাই দমনের জন্য বিভিন্ন সময় কীটনাশক স্প্রে করা হয়। বাগানের পরিচর্যা করা হয়। ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য যে সব কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তার থেকে ১৫ থেকে ২০ দিন পরে সেই আম খেলে কোন সমস্যা হয় না বলে আম গবেষকরা জানান। অনেক সময় আমের চেহারা ভাল রাখার জন্য শ্যাম্পু জাতীয় কেমিক্যাল গাছে স্প্রে করা হয়। সুন্দর আকৃতির আমই সাধারণত ক্রেতারা বেশি পছন্দ করেন। তাই বাগান ক্রেতারা বাজারে বেশি দামের আশায় গাছেই আমের পরিচর্যা করে থাকেন। পোকামাকড়, ধুলাবালি আমের গায়ে যেন না থাকে সে জন্যই ঘন ঘন বিভিন্ন কেমিক্যাল স্প্রে করতে হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ আম উত্পাদন হয় শিবগঞ্জে। শিবগঞ্জের আমের বড় বাজার কানসাটে। দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আমের ক্রেতারা এসে কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকিয়ে চালানের প্রথা চালু করেন। পূর্বে কানসাট বাজার, গোমস্তাপুর রেলবাজার, নাচোলের মল্লিকপুর বাজার, ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের আমবাজার আড়তে টুকরিতে আম ভর্তি করে ট্রাকে চালান যেত ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, যশোর, ফেনীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে। ব্যবসায়ীরা এই জেলার ওইসব আমবাজারগুলোতে শুরু করেন অধিক মুনাফার লোভে কারবাইডের ব্যবহার। অপরদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়া দেশের অন্যান্য এলাকায় আমগাছে মুকুল আসে আগে। এসব এলাকার আম ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম ব্যবহার করে কার্বাইড দিয়ে পাকানো আম বিক্রি করেন। এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার আয়োজিত আম বিষয়ক সেমিনারে জেলা প্রশাসক সরদার সরাফত আলী বলেন ‘আমি ঢাকার একটি মার্কেটে দেখি ব্যানারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ উল্লেখ করে আম বিক্রি হচ্ছে। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজারেই আসেনি। আমি বললামঃ ভাই চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখনও আম পাকেনি। তবে কেন ব্যানারে লিখে অন্য আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের নামে বিক্রি করছেন? তখন ওই ব্যবসায়ী ব্যানার গুটিয়ে ফেলেন’। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গুটিসহ সুস্বাদু আম খেতে হলে বিভিন্ন জাতের কাঁচা কিনে দু-চারদিন ঘরে রেখে খেলে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু জানা যায়, শহরের লোকেরা পাকা আম পছন্দ করেন। তাই একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা শহুরে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী কার্বাইডে পাকানো আম বাজারে আমদানি করেন। কাঁচা আম কেনার অভ্যাস করলে ভোক্তারা বিষমুক্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে যেসব ব্যবসায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে আম চালান দেন সেসব চালানে আমের জাত উল্লখ করতে হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা উন্নতজাতের আমের নাম করে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন। এই জেলার উন্নতজাত হলোঃ গোলপাভোগ, ক্ষিরসাপাত (হিমসাগর), ল্যাংড়া, কালীভোগ, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, ফজলি, চোঙ্গা ফজলি, সুরমা ফজলি প্রভৃতি। এছাড়া নাম না জানা অনেক জাতের আম অত্যন্ত সুস্বাদু। বাজারে এইসব আম ব্যবসায়ীরা নিজেদের পছন্দমত মনগড়া নাম দিয়ে বিক্রি করেন। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমবাজারে ক্ষিরসাপাত বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ৫শ’ টাকা মণ দরে, লক্ষণভোগ প্রতিমণ ১ হাজার ৮শ’ টাকা থেকে ২ হাজার ২শ’ টাকা, বগলাইড় ২ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার ২‘শ টাকা, ল্যাংড়া প্রতিমণ ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার। গুটি আম ম্যাংগো পাল্প বা জুসের কারখানায় ৬শ’ থেকে ৭‘শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গুটি আম ও আশ্বিনা আমে পাল্প বা জুস তৈরি হয়, উন্নত জাতের আমে পাল্প তৈরি হয় না।