ইরানের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা খেলা শুরু হওয়ার আগে যে আনন্দ নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকেছিলেন। ঠিক একই চিত্র ছিল খেলা শেষ হওয়ার পরও। আর্জেন্টিনার স্পিড, ট্যাকটিক্যাল আর টেকনিক্যাল খেলার বিরুদ্ধে ৯০ মিনিট হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ইরান টিকতে পারলো না। ইরানের ডিফেন্ডার জালাল, আমির হোসেন, জাবেদ, মাঝমাঠে রেজা আশকান, মেহেরদাদরা ৯০ মিনিট থামিয়ে রাখলো আর্জেন্টিনাকে। ইনজুরি টাইমে এসে সব শেষ হয়ে গেল। ইরান আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে জয় চায়নি। তারা চেয়েছিল খাটো দেখার সঠিক জবাবটা মাঠে দিয়ে দিতে। ইরানী দর্শকরা আফসোস করেছেন। শেষ একটু সময়টা যদি রাখা যেতে তাহলে তো সেটা ইরানের জন্য ইতিহাস হয়ে থাকতো। ইরানীদের ড্রেসিং রুমে কান্নার রোল পড়েছিল বলে জানা গেছে। কোচ গিয়ে তাদের গালে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়েছেন। ইরানী সাংবাদিকের সূত্রে জানা যায়, ইরান সরকার প্রধানও ফোন করে কথা বলেছেন খেলোয়াড়দের সাথে। সান্ত্বনা দিয়েছেন বলেছেন, ‘তোমার ভালো খেলেছো। মন খারাপ করো না।’ ইরানী ফুটবলাররা ম্যাচ শেষ হওয়ার দুই ঘন্টা পর ড্রেসিং রুম থেকে বের হয়ে টিম বাসে উঠেন। এসময় ফুটবল সংশ্লিষ্টরা তাদেরকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন সবাই। ইরান প্রথমবার ১৯৭৮-এ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপ পর্যায়ে খেলেছিল। তাদের সাফল্যের ডেরায় আরো আছে ৯৮-এ ফ্রান্স এবং ২০০৬-এ জার্মানী বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে খেলার অভিজ্ঞতা। আলীদায়ি ছিলেন ইরানী ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপন। বিশ্ব ফুটবল র্যাংকিংয়ে ইরান এক সময় ১৫ নম্বরে ছিলো। এখন ৩৭ নম্বরে। বিশ্বকাপ ফুটবলে ইরান এপর্যন্ত ১০ ম্যাচ খেলেছে। একমাত্র জয়টি এসেছে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ ফুটবলে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়েছিল ২-১ গোলে।
আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচের দিন সেদেশে স্বাভাবিক কোনো কাজই হয়নি বলে জানা গেছে। সবাই টিভির সামনে গিয়ে বসেছিল বলে ইরানী রেডিওর সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে। ইরানীরা বেলে হরিজোন্তের স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। বলেছেন, ‘আমারা ভালো খেলেছি আলহামদুলিল্লাহ। তারা জানিয়ে গেছেন ইরান স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দিয়ে গেছে ব্রাজিলে।’
আর্জেন্টিনা সারাজীবন এই ম্যাচের কথা স্মরণ করবে বলে জানিয়েছেন। ইরানের পর্তুগীজ কোচ কার্লোস কুইয়েরজ তার ক্যারিয়ারে এমন সুযোগ নাকি আর পাননি। গোলশূন্য ম্যাচটা ধরে রাখাটা ছিল জয়ের চেয়েও বেশি কিছু। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার শক্তি নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না। কারণটা সবাই জানেন।’
আর্জেন্টিনার আগুয়েরা, মেসি, হিগুয়েনদের আটকাতে সবচেয়ে সঠিক কাজটি ছিল ওদরে খেলতে না দেয়া। ইরান সেটাকে লক্ষ্য রেখেই মাঠে নেমেছিল। কিন্তু ইরান পুরোপুরি ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলছে। আর্জেন্টিনা যেটার সাথে পেরে উঠেনি। আর্জেন্টাইন আক্রমণগুলো বার বার নষ্ট হয়েছে ইরানের গোল মুখে। ইরানী কোচ বলেছেন, ‘যেটা করা দরকার ছিল সেটাই করেছি।’
দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে ইরান যেন সময়ের সাথে সাথে আর্জেন্টিনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোচ দাবি করেছেন তাকে পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত করেছেন রেফারি, ‘খেলা দেখে মনে হচ্ছে রেফারীরা ব্রাজিল আর্জেন্টিনাকে বাঁচাতে মাঠে নেমেছেন।’ তিনি ব্রাজিল ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে নেইমারের পেনাল্টি গোলটি নিয়ে কথা বলেন। আর্জেন্টিনার গোলপাষ্টে তিনবার গোলের সুযোগ পেয়েও ইরানীরা সফল হতে পারেননি। সেটাকে দুর্ভাগ্য বলেছেন ইরানের পর্তুগীজ কোচ। গোল হলে কী হতো ?
এই কোচ বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছেন, ‘ম্যাচ বদলে যেতো। শেষ মুহূর্তে এসে গোলটা খেয়েছি একটু ভুলের কারণে। আপনারাও বুঝেন এমন দলের সাথে টিকে থাকাটাই তো অনেক কঠিন ব্যাপার।’ ইরানী কোচের কথা ঠিক। কারণ ফুটবল পন্ডিতরা তো আগেই ব্রাজিলের বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন একতরফা ম্যাচ হবে। আর্জেন্টিনা জিতবে বড় ব্যবধানে। ফুটবল পন্ডিতদের সেকথা হয় তো মিলেনি। তবে এটাতো প্রমাণ হয়েছে, নিজেদের দেশে অনেক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও ইরান ভালো ফুটবল খেলেছে এবং তাদের সুন্দর ফুটবল ভবিষ্যত্ প্রমাণ করেছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল দলের যে গতি। তাদের সাথে পেরে উঠা খুব কঠিন। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু গতিময় ফুটবল খেলেও আর্জেন্টিনার জয় পেতে ৯১ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত ৪ মিনিট দেয়া হয়েছিল। সেই ৪ মিনিটের প্রথম মিনিটেই মেসি তার পায়ের জাদুটা দেখিয়ে ম্যাচ জয় করে নিয়ে গেছেন। হয় তো ভাগ্যে এটা ছিল। ইরান আর্জেন্টিনাকে আটকে রেখেছিল নাকি মেসি অপেক্ষায় রাখলেন ফুটবল দুনিয়াকেও বুঝা গেলো না। তবে মেসির হাতেই ছিল সেই যাদুর কাঠিটা। যেটা দিয়ে ম্যাচটা তুলে নিয়েছেন। ইরানকেও সাধুবাদ জানিয়েছেন মেসি, ‘ওরা ভালো খেলেছে। ম্যাচটা এতো কঠিন হবে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’
মেসিদের সমীহ আদায়ই ইরানের জন্য দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখলো!
