তলিয়ে গেছে বন্দর নগরী

আপডেট : ২২ জুন ২০১৪, ২২:১৫
তিনদিনের টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী। গতকাল রবিবারও নগরীর নিচু এলাকাগুলো হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। নগরীতে রিকশা ছাড়া গণপরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজে করে নৌ-পথে পণ্য পরিবহন ও খালাস বন্ধ রয়েছে। পণ্য লোড ও আনলোড বন্ধ থাকায় সড়ক পথেও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। পাহাড়ি ঢলে সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় গতকাল চট্টগ্রামের সাথে রেল যোগাযোগ প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকে। প্রবল বর্ষণের মধ্যেও পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো উচ্ছেদ করেছে জেলা প্রশাসন। সিটি কর্পোরেশন নগরীর স্কুলগুলো আশ্রয় কেন্দ হিসেবে ঘোষণা করেছে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বেচা-কেনা স্থবির হয়ে পড়েছে। তৃতীয় দিনের মতো গতকাল বন্দরনগরীর বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। থেমে থেমে সারাদিন ভারী বর্ষণ হয়েছে। এতে নগরীর নিচু এলাকা বিশেষ করে বহদ্দারহাট, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, ষোলকবহর, ২নং গেইট, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, কাপাসগোলা, হালিশহর, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এতে এসব এলাকার নিচতলার বাসিন্দা ও দোকানপাটের পণ্য সামগ্রী ও আসবাবপত্র পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। নিচতলায় বসবাসকারীদের ঘরে আসবাবপত্র নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। পানি ঢুকে পানির মোটর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। খাবার ও ব্যবহারের পানি নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে বাসিন্দারা। জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহন চলাচল সকাল থেকে বন্ধ হয়ে যায়। এতে কর্মজীবী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। যানবাহন না পেয়ে পানির মধ্যে পায়ে হেঁটে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে হয়েছে। কয়েকদিন ধরে নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পরীক্ষা চলছে। স্কুলে পানি ঢুকে পড়ায় বেশ কয়েকটি সরকারি স্কুলে পরীক্ষা স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। জলাবদ্ধতার কারণে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে বস্তিতে বসবাসকারী হতদরিদ্র মানুষ। গতকাল টানা বর্ষণের মধ্যেও পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে জেলা প্রশাসন। নগরীর একে খান পাহাড়, বায়েজিদ বোস্তামী, রৌফাবাদ এলাকায় গতকাল উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় এই অভিযান চালানো হয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এসএম আবদুল কাদের ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা গতকাল প্রায় ৩০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করেছি। উচ্ছেদ হওয়া এসব পরিবারকে ৬টি স্কুলে রাখা হয়েছে। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে; কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া এসব লোক আমাদের অজান্তে আশ্রয় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে গিয়ে পুনরায় ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে অবস্থান নিচ্ছে। এদিকে পাহাড়ি ঢলে সীতাকুণ্ডের মাদাম বিবিরহাট নেভি গেইট এলাকায় রেল লাইন ডুবে ?যাওয়ায় ও একটি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় গতকাল রবিবার সকাল ১১টা থেকে চট্টগ্রামের সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। এতে কয়েকটি ট্রেন আটকা পড়ে যায় মাঝপথে। সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি ও কুমিরার মাঝামাঝি ৩৪ নম্বর ব্রিজটি ডুবে গেছে। ব্রিজের ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী ?দুইটি রেল লাইনের দুই পাশের মাটি সরে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিকাল ৪টায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন মেরামতে কাজ চলছে। আপাতত একটি রেল লাইন দিয়ে চট্টগ্রামের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের ট্রেন চলাচল করবে। মেরামত কাজ শেষ হলে দুই লাইনে ট্রেন চলাচল চালু করা হবে।’ সমুদ্র উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে পণ্য পরিবহন গত তিনদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্দর সূত্র জানায়, বহির্নোঙরে আমদানি করা পণ্য নিয়ে খালাসের জন্য প্রায় ৩০টি জাহাজ অপেক্ষা করছে। বৃষ্টির কারণে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৮০টি লাইটারেজ জাহাজ পণ্য পরিবহন করে থাকে। এছাড়া মাঝিরঘাটের পণ্য খালাসের ১৬টি ঘাট বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টির কারণে গুদাম থেকে পণ্য বোঝাই ও খালাস হচ্ছে না। চট্টগ্রামের গুদাম থেকে সড়ক পথে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম বলেছেন, চট্টগ্রামের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য বিশাল অংকের বরাদ্দের কথা বলছে। এটা চট্টগ্রামের জন্য দরকার; কিন্তু ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে বরাদ্দ দেয়া না হলে চট্টগ্রামের দুর্দশা ঘুচবে না। তিনি বলেন, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী একটি খাল খনন করার জন্য ২৯৭ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পাঠানো হলেও দুই বছরে তা অনুমোদন পায়নি। অথচ এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশনও নিজস্ব তহবিল থেকে ৭০ কোটি টাকা দেয়ার কথা বলেছে। মেয়র বলেন, ১৯৯৫ সালে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করা হলেও এ পর্যন্ত কেউ এর বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি। তার দায়িত্ব্ নেয়ার পর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী নিজস্ব অর্থায়নে দুইটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। দুটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এছাড়া নগরীর লালখান বাজার বাঘঘোনা এলাকায় গতকাল রবিবার বিকালে পাহাড় ধসে পড়ে চারতলা বিশিষ্ট একটি ভবনে। এতে ভবনের দ্বিতল পর্যন্ত ধসে পড়েছে পাহাড়ের মাটি। পাহাড়ের উপর পাঁচতলা বিশিষ্ট অপর ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই দুটি ভবনে প্রায় ২৮টি পরিবার বসবাস করে। বর্ষণ অব্যাহত থাকলে দুটি ভবনই ধসে পড়ার আশংকা রয়েছে। মাটি ধসে পড়ার পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বসবাসকারীদের দ্রুত অন্যত্র সরে যেতে বলেছেন। স্থানীয়রা জানান, বাঘঘোনা এলাকায় সুরাইয়া বেগমের মালিকানাধীন কানুনগো সাহেবের চারতলা ভবনের উপরে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়লে বিকট শব্দ হয়। এ সময় ভবনে থাকা বাসিন্দারা চিত্কার শুরু করে। আশপাশে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তারা দেখতে পায় পাহাড়ের উপর থেকে মাটি, বালির বস্তা আর গাছপালা ধসে ভবনের উপর পড়ছে। স্থানীয় আরো জানান, পাহাড়ের উপর জনৈক ইসমাইল কন্ট্রাক্টর পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করায় পাহাড়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ভবন নির্মাণের সময় পাহাড় থেকে মাটি কাটা হয়েছে। ফলে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণের কারণে মাটি ধসে পড়েছে। এতে ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।