বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তার দলের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বলেছেন, অন্যথায় ঈদের পর জোরেশোরে আন্দোলন করে এই সরকারকে সরাবো। তিনি বলেন, আমাকে বাড়িতে বন্দী করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। আমি আন্দোলনে জনগণের সঙ্গে রাজপথে থাকবো। বাধা দিলে হরতাল, অবরোধ, অসহযোগ কর্মসূচি দেয়া হবে।
গতকাল রবিবার বৃষ্টির মধ্যে জয়পুরহাট আর.বি হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় বেগম জিয়া জনগণকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই সরকার আমাদের কাছে এখন বৈধতা চাচ্ছে। বিএনপি বৈধতা দেয়ার মালিক নয়। বৈধতা দেয়ার মালিক জনগণ। বৈধতা পেতে হলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা জড়িত এমন অভিযোগ এনে তিনি বলেন, আপনি দেশে আসার ১৩ দিন পর জিয়াউর রহমান শহীদ হলেন। তাহলে নিশ্চয় কোন সমস্যা আছে। কেন সেদিন আপনি পালাতে চেয়েছিলেন। আপনাকে প্রশ্ন করবো, তাহলে কি আপনার মধ্যে ভয় ছিল।
খালেদা জিয়া দুই দিনের উত্তরবঙ্গ সফরের শেষ দিন রবিবার দুপুরে বগুড়া থেকে জয়পুরহাটে পৌঁছান। তিনি সরাসরি সমাবেশ মঞ্চে উপস্থিত হন। তার আগমন উপলক্ষে জয়পুরহাটকে অসংখ্য তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়। সমাবেশে জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী প্রধানের সভাপতিত্বে আরো বক্তৃতা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. অব. মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, যুগ্ম-মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন অর রশীদ, আসাদুল হাবিব দুলু, জেলা বিএনপি নেতা সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান প্রমুখ।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আজকে আওয়ামী লীগ বুঝেছে, তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। জনগণ পাশে নেই। তাই তারা দিশেহারা। পাশের দেশে নির্বাচন হয়েছে। সেখানেও সরকার পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনে তারা হতাশ। নার্ভাস হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা চাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক। তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায়। খুনি, দখলদার সরকারের হাত থেকে বাঁচতে চায়। এজন্যই ভোট দরকার। তাই অবিলম্বে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে প্রমাণ করুন জনগণ কাদের সঙ্গে আছে।
খালেদা জিয়া বলেন, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪ জন ভোট ছাড়াই জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। ভোট ছাড়া কি জনপ্রতিনিধি হওয়া যায়। তাই মোজাহার-ই এখনো আপনাদের এমপি। কারণ আগের পার্লামেন্ট বাতিল হয়নি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ভোট হবে না। এ কারণে আমরা জনগণকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে নিষেধ করেছিলাম। উপজেলার প্রথম পর্বে কিছুটা নিরপেক্ষ হওয়ায় আমরা বিপুল জয় পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম পর্বে এমন কারচুপি করলো যে তারা জনমত ছিনিয়ে নিল।
আওয়ামী লীগ দুর্নীতিবাজ সরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম বলছে, আওয়ামী লীগের এই আমলে নাকি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে। তারা কেবল টাকা চুরি করে। পদ্মা সেতু থেকে টাকা চুরি করেছে। শেয়ারবাজার থেকে চুরি করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লুট করেছে। নিরপেক্ষ তদন্ত করে সুইস ব্যাংকে কার টাকা এবং কারা টাকা পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুদক কি অন্ধ। চোখ বন্ধ করে রেখেছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে কেবল বিএনপিকে হয়রানি করছে। চোখ দু’টি খুলে রাখেন। আওয়ামী লীগের যারা টাকা পাচার করেছে, তাদের ধরেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ আমাদের ৩১০ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। ৩৫৬ জনকে গুম করেছে। এর সঙ্গে জড়িত এই সরকার এবং সরকারি বাহিনী।
খালেদা বলেন, কিভাবে নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নীলফামারি, জয়পুরহাট ও সাতক্ষীরায় র্যাব মানুষ হত্যা করেছে। র্যাবে জিয়া আছে, তারেক সাঈদ আছে, ওরা হত্যাকারী। এই র্যাব আর প্রয়োজন নেই। র্যাব বাতিল করতে হবে। র্যাব বিলুপ্ত করে প্রয়োজনে নতুন সংগঠন তৈরি করা হবে। গুম-হত্যায় যারা জড়িত তাদের বিচার করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, এই সরকার বিচার বিভাগকে পকেটে পুরেছে। বিচারকরা অসহায়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। আজকের দেশে দুই রকমের বিচার। সাধারণ মানুষ ও বিএনপির জন্য এক ধরনের বিচার। আর আওয়ামী লীগের জন্য অন্যরকম বিচার। বিচারকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা নির্ভয়ে নিরপেক্ষ বিচার করুন, যাতে সাধারণ মানুষ কোনো রকম হয়রানির শিকার না হয়।
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের সোনার ছেলেরা গুন্ডামিতে নেমেছে। ক’দিন আগে মিরপুরে বিহারিদের ঘরে তালা লাগিয়ে মা, বাচ্চাসহ নয়জনকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগ। সেই তথাকথিত এমপি এখনো গ্রেফতার হয়নি। অবিলম্বে এই তথাকথিত এমপিকে গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে খালেদা বলেন, এর মাধ্যমে নারী সমাজ অনেক উন্নতি করেছে। এই গ্রামীণ ব্যাংকের উদ্যোক্তা ভালো কাজ করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এজন্য আমাদের গৌরবান্বিত হওয়া উচিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ এ রকমের একটি লোককে পর্যন্ত অপমান করে, অসম্মান করে। তিনি বলেন, আমরা ভাল মানুষের সম্মান ফিরিয়ে দেব। বিএনপি জোট ক্ষমতায় এলে ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক ফিরিয়ে দেয়া হবে। গ্রামীণ ব্যাংকে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, কৃষক ভাইদের বলি, আপনাদের না বলেছিল, বিনামূল্যে সার দেবে সরকার। কিন্তু তারা সারের দাম আরও বাড়িয়েছে। বীজের দাম বাড়িয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। উত্পাদিত খরচেও ধান কিনে না। কৃষকও ক্ষতিগ্রস্ত। এই আওয়ামী লীগ থাকলে কৃষকের কোনো উপকার হবে না।
বিএনপি নেত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিও এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে নিতে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথে। আওয়ামী লীগ যখনই আসে, দুর্নীতি, গুম-খুন বেড়ে যায়। স্বাধীনতার পর রক্ষী বাহিনী করে তারা মানুষ হত্যা করেছে। আপনাদের কি মনে নেই। রক্ষী বাহিনীর সেই হত্যার কথা।
বেগম জিয়া আরো বলেন, জিয়াউর রহমান প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। আর আওয়ামী লীগ হলো সীমান্ত পাড়ি দেয়া মুক্তিযোদ্ধা। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার দল বিএনপি।
সমাবেশের এক পর্যায়ে নেতাকর্মীরা হরতালের পক্ষে স্লোগান দিলে তিনি বলেন, হরতাল হরতাল করেন, তবে এখন নয়। ঈদের পর সব কর্মসূচি দেবো। আমাদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে হরতাল, অবরোধ, অসহযোগসহ সব কর্মসূচিই দেয়া হবে। সমাবেশ শেষে খালেদা জিয়া স্থানীয় সার্কিট হাউজে বিশ্রাম নেন। পরে রাতে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন।
