রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার জন্য আজ সোমবার দিন ধার্য রয়েছে। ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক রুহুল আমিন এ রায় ঘোষণা করবেন। দীর্ঘ ১৩ বছর আগে করা এই মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষে গত ১৬ জুন এ মামলার রায় ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু তা প্রস্তুত না হওয়ায় ওই দিন রায় ঘোষণা করা যায়নি। এরপর আজ রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রেখে আদেশ দেন বিচারক। রায় ঘোষণা উপলক্ষে পুরান ঢাকার আদালত পাড়ায় নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। এছাড়া সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ তো রয়েছেই।
২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল (বাংলা ১৪০৮ সালের ১ বৈশাখ) ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলায় নিহত হয় ১০ জন। হামলার ঘটনায় রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলায় হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে মুফতি হান্নানসহ নয় আসামি কারাগারে রয়েছেন। আসামি মুফতি হান্নান, আকবর ও আরিফ বোমা হামলার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
জানা যায়, রমনা বটমূলে বোমা মেরে মানুষ হত্যার ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। হত্যা মামলায় রায় ঘোষণায় দিন ঠিক হলেও অন্য মামলাটি ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। ঘটনার প্রায় আট বছর পর ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের মধ্যে মুফতি হান্নান, মাওলানা আকবর হোসেন, আরিফ হোসেন সুমন, শাহাদাতউল্লাহ জুয়েল, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা শওকত হোসেন ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা আবু তাহের ও মাওলানা ইয়াহিয়া কারাগারে রয়েছেন। বাকি পাঁচ আসামি মাওলানা তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে মাওলানা হাফেজ সেলিম হাওলাদার মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই পলাতক।
আলোচিত এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বারবার পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল, বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসা ইত্যাদি কারণে মামলার বিচার শুরু হতে বিলম্ব হয়। পর্যায়ক্রমে থানা, ডিবি ও সিআইডি পুলিশে মামলার তদন্ত যায়। মামলার অষ্টম তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দুটি মামলারই অভিযোগপত্র একসঙ্গে দাখিল করা হয়। পরে বিচারের জন্য মামলা দুটি ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায়। ওই আদালতে একই বছরের ১৬ এপ্রিল পৃথকভাবে মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সিদ্ধান্তে হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এ এবং বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ পাঠানো হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ না হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী মামলা দায়রা আদালতে ফেরত যায়। ফলে হত্যা মামলাটি আবার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে স্থানান্তর হয়। গত বছরের ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এরপর গত ১০ নভেম্বর আসামি আত্মপক্ষ সমর্থন করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জবানবন্দি দেন। মামলার নথিতে ৮৪ জন সাক্ষীর নাম উল্লেখ থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৬১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, একই ঘটনায় একই আসামিদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন। এ ট্রাইব্যুনালের তত্কালীন বিচারক ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর এ মামলার কার্যক্রমের উপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি আবেদন পাঠান। এখন পর্যন্ত রেজিস্ট্রারের দপ্তর থেকে ওই আবেদনের কোন সিদ্ধান্ত সংশ্লি¬ষ্ট আদালতে পৌঁছেনি বলে জানান ওই আদালতের পিপি আবু আবদুল্ল¬াহ ভুঁইয়া। ফলে এ মামলাটির বিচারে কোন সুরাহা হচ্ছে না।
