অর্থনীতি ভালো থাকলেও ব্যাংকের ঝুঁকি বেড়েছে

আপডেট : ২৮ মে ২০১৯, ২১:২৩

২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনীতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল ছিল। প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা আগের অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, রপ্তানি বাণিজ্য এবং ওয়েজ আর্নার’স রেমিট্যান্স ভালো ছিল। তবে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বেড়েছে ঝুঁকির পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল এ রিপোর্ট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রিপোর্টে উঠে এসেছে, ব্যাংকিং খাতের নিট মুনাফা ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। সম্পদের বিপরীতে আয় হার ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। মূলধনের বিপরীতে আয়-হার ৬০০ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ব্যাসেল-৩ মূলধন কাঠামোর আওতায় নির্ধারিত মাত্রা শতকরা এক দশমিক ৮৭৫ এর বিপরীতে ব্যাংকিং খাত শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করেছে।

২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি সহনীয় মাত্রায় ছিল। সার্বিক ঝুঁকি পরিমাপক নির্দেশক রিস্ক ওয়েডেট অ্যাসেট ডেনসিটি রেশিও বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতের মোট ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের মধ্যে ঋণ ঝুঁকির পরিমাণ ছিল ৮৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি ২০১৮ সালে তুলনামূলক চাপের মুখে ছিল। বছর শেষে আগাম-আমানত অনুপাত বেড়ে ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশে হয়। এই সময়ে কলমানি হারে মিশ্র প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য ব্যাংকিং খাতে সম্পদ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণ ও আগাম ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং আমানত ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে সার্বিক অর্থনীতি বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কিছুটা কমে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে রপ্তানি বাণিজ্য এবং ওয়েজ আর্নার’স রেমিট্যান্স যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪ ও ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে আমদানি বাণিজ্য ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসেবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। এটি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি হিসেবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঋণাত্মক প্রবণতা দেখা দেয়।

 গতকাল এ প্রতিবেদনের মোড়ক উম্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির। ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান, চেইঞ্জ ম্যানেজমেন্ট এ্যাডভাইজর আল্লাহ মালিক কাজেমি, ব্যাংকিং রিফর্ম এডভাইজর এস কে সুর চৌধুরী। এছাড়াও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার অধ্যাপক স্বপন কুমার বালা, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী পরিচালক ড. শেখ মো. রেজাউল ইসলাম, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর সহ-সভাপতি শফিকুল আলম, বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি  আরিফ খান উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনটির ওপর একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন প্রদান করেন ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক ড. মো. কবির আহাম্মদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম হিসেবে পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সম্পৃক্ত। ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থ, বাণিজ্য ও রাজনীতিতে সংঘটিত নানা পরিবর্তন আমাদের জন্য বিভিন্ন আশঙ্কার পাশাপাশি সম্ভাবনার সুযোগও তৈরি করছে। তিনি আর্থিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতির প্রতি গভীর মনোযোগী থাকার পরামর্শ প্রদান করেন।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক শ্লথ প্রবৃদ্ধির হার ও নানামুখী ঝুঁকি সত্ত্বেও নিম্নমুখী মুদ্রাস্ফীতি, রেমিটেন্স ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রবৃদ্ধি সহায়ক নীতিমালার পাশাপাশি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ফলে বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত মন্দঋণ কমাতে ব্যাংকারদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। দেশের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে ঋণ ও আমানতের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের প্রতি আহ্বান জানান।