চট্টগ্রাম মহানগরীসহ আশেপাশের ১২টি পাহাড়ে প্রভাবশালীদের গড়ে তোলা শত শত অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদে প্রশাসনের উদ্যোগের কোনো অগ্রগতি নেই। অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও এইসব জনবসতি উচ্ছেদে প্রশাসনকে দৃশ্যত অসহায় মনে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে নগরীর পাহাড়ের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতিতে থাকা কয়েকশ’ পরিবারকে সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা ছাড়া প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানে কোনো জোর দেখা যাচ্ছে না।
এইসব পাহাড়ের ঝুপড়িতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চট্টগ্রামে আসা প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের ৫০ হাজার সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে বলে কয়েকটি বেসরকারি জরিপে বলা হয়েছে। এরা নিম্নআয়ের শ্রমজীবী; যাদের অধিকাংশই গার্মেন্টস শ্রমিক। অবশ্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন নগরীর পাহাড়ের পাদদেশে ও ঢালে বসবাসকারী অতিঝুঁকিপূর্ণ মাত্র ৬৬৬টি পরিবারকে চিহ্নিত করেছে বলে জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান।
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সূত্র জানান, চট্টগ্রামে পাহাড় দখল করে ভাড়াটে সন্ত্রাসী ও মাস্তানদের মাধ্যমে বস্তি বানিয়ে সেখানে শত শত শ্রমজীবী পরিবারকে ঘর ভাড়া দিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে রেখে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা আয়কারী প্রভাবশালীদের একটি যৌথতালিকা প্রস্তুত করেছে তিনটি গোয়েন্দা সংস্থা। তারা তালিকাটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। ১০/১২ দিন আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তালিকাটি চট্টগ্রাম প্রশাসনে ফেরত পাঠানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ১৪তম সভায় কমিটির সভাপতি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ঐ তালিকার কিছু অংশ পাঠ করে শোনান। তবে প্রভাবশালীদের নামগুলো তিনি পাঠ করেননি।
চট্টগ্রামের যেসব এলাকার পাহাড়ে অবৈধ ঘরবাড়ি ও জনবসতি গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ষোলশহর পাহাড়, পলিটেকনিকের পেছনে পাহাড় কাটা বসতি, পূর্ব নাসিরাবাদের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা, মেডিক্যালের পাশে গোয়াসিবাগান পাহাড়, সিআরবি’র পাশে কদমতলী পাহাড়ি ঝুপড়ি, বাটালি হিল, টাইগারপাস আমবাগান পাহাড়ি ঝুপড়ি, আকবর শাহ এলাকার বিশ্ব কলোনি, পুলিশ লাইন সংলগ্ন কুসুমবাগ, লালখান বাজার বাঘঘোনা পাহাড়, মতিঝর্ণা বস্তি, ফয়’স লেক আনসার পাহাড়, জালালাবাদ-অক্সিজেন পাহাড়ি এলাকা ও সেনানিবাস সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা। যেসব সংস্থা এইসব পাহাড়ের মালিক সেগুলো হচ্ছে রেলওয়ে, ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, পিডব্লিউডি, হাউজিং ও সেটেলমেন্ট বিভাগ। তবে বেদখল হয়ে যাওয়া পাহাড়ের মধ্যে রেলওয়ের পাহাড়ই সবচেয়ে বেশি বলে নগর বিশেষজ্ঞ সূত্রগুলো জানায়।
অভিযোগ আছে, পাহাড়সমূহের মালিক সংস্থারই একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রভাবশালী মহল সন্ত্রাসী চক্রের মাধ্যমে পাহাড় দখল করে ঘরবাড়ি তুলে স্বল্প আয়ের মানুষদের ভাড়া দিচ্ছে। এমনকি তারা তাদের এইসব অবৈধ স্থাপনায় গ্যাস, বিদ্যুত এবং ওয়াসার সংযোগও স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে পাহাড় ধসে ঘন ঘন প্রাণহানির জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত নগরীর লালখান বাজার এলাকার একজন কাউন্সিলর এবং একজন নারী কাউন্সিলরের নাম দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় দখল করে অবৈধ ঘরবাড়ির ব্যবসা পরিচালনার সাথে যুক্ত থাকার কথা শোনা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জিনিয়ার আলী আশরাফ ইত্তেফাককে বলেন, প্রভাবশালী বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, রেলের একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় কিছুসংখ্যক ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও তাদের অনুগত সন্ত্রাসী-মাস্তান বাহিনী পাহাড় দখল করে অবৈধ জনবসতি গড়ে স্বল্প আয়ের মানুষদের ভাড়া দিচ্ছে এবং তাদেরকে মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে বসবাস করতে প্রলুব্ধ করছে। তিনি জানান, এই দুর্বৃত্ত সিন্ডিকেট যতদিন থাকবে পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
এদিকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এস এম আবদুল কাদের ইত্তেফাককে বলেন, পাহাড়ে গড়ে তোলা সব বাড়িঘরই অবৈধ। এসব ঘরবাড়ির অনেকগুলোর বিদ্যুত্ সংযোগ সমপ্রতি কেটে দেয়া হয়েছে। এপর্যন্ত ৮০০ পরিবারকে তাদের পাহাড়ি ঢালের ঘর থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। তবে অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
উল্লেখ্য, এক পরিসংখ্যান মতে ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের ঘটনায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।
