মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। উত্সবমুখর পরিবেশ, বর্ণিল নানা আয়োজন ও যথাযোগ্য মর্যাদায় রাজধানীসহ সারাদেশে উদযাপিত হয় দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের জন্মদিন।
সকাল ৭টা ১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে দলের পক্ষে সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনসহ পায়রা এবং বেলুন উড়িয়ে আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ সময় জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাহারা খাতুন, সতীশ চন্দ্র রায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ প্রমুখ।
দিবসটি উপলক্ষে সূর্য উদয় ক্ষণে আওয়ামী লীগের কেন্দ ীয় কার্যালয় ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘শিখা চিরন্তন’ থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত গণশোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সকালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ৬৫ বছরে আওয়ামী লীগের অর্জন অনেক। আওয়ামী লীগ অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে, আগামীতে আরও অর্জন করবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ৬৫ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুথান. সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেয়। এই অর্জনের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে। এ অর্জনগুলোকে নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যতে আর কী কী অর্জন করতে চান সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফ বলেন, আপনারা তা দেখতে পাবেন। তিনি বলেন, অনেক রাজনৈতিক দল আছে তারা কয়েকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়েছেন এবং অনেকবার তারা আন্দোলন করেছেন, সংগ্রাম করেছেন কিন্তু কমই রাজনৈতিক দল আছে যারা ঠিকমত দেশ চালিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রায় জনজোয়াড়
রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবন পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় চার কিলোমিটার পথই যেন পরিণত হয়েছিল একটি মিছিলে। মানুষের স্রোত নামিয়ে রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করেছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী এ দলটি।
আওয়ামী লীগের জন্মদিন উপলক্ষে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে সমাবেশ পরবর্তী গণশোভাযাত্রার আয়োজন করে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ। গণমিছিলের প্রস্তুতি ছিল সামান্যই। কিন্তু কর্মসূচিতে মানুষের তীব্র স্রোত দেখে আয়োজকরাও হতবাক হয়ে যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনের চতুর্দিকে এতো মানুষের স্থান সংকুলান হবে না, এটা আঁচ করতে পেরে মঞ্চের চতুর্দিকে প্রায় এক কিলোমিটার পথেই শত শত মাইক টানিয়ে দেয় আয়োজকরা।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে গণশোভাযাত্রার অগ্রভাগ যখন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন পৌঁছায়, তখনও পশ্চাত্ভাগ শাহবাগ মোড় পার হতে পারেনি। শোভাযাত্রাপূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগের লাখ লাখ কর্মীরা আজ ঐক্যবদ্ধ। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার বিষদাঁত ভেঙ্গে দেবে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আন্দোলন করে সরকার পতন ঘটালে কিসের আলোচনা? ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচন হবে না। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আসুন আলোচনা করি, একটি ভালো নির্বাচন করি। তখন শেখ হাসিনার সাথে দুর্ব্যবহার করেছে, অপমান জনক কথা বলা হয়েছে। এখন আলোচনার কথা বলেন। বিদেশিদের কাছে ধরনা দিচ্ছে। হুমকি দিচ্ছেন আন্দোলনের। আন্দোলন করে নাকি আমাদের পতন করবেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ সেলিম বলেন, অনুপ্রবেশকারীরা যেন আওয়ামী লীগে ঢুকতে না পারে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহারা খাতুন বিএনপি নেত্রীর উদ্দেশে বলেন, আপনি আন্দোলনের কথা বলেন, আজকের লোকসমাগম দেখে যান। রোজার পর আন্দোলন করবেন? কিসের আন্দোলন? আপনার আন্দোলন হলো মানুষ হত্যার আন্দোলন। বাংলার মানুষ আপনাকে আর কোন আন্দোলন করতে দেবে না। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করতে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং গৃহায়ন গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিএনপি-খালেদা যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সেই আন্দোলন করতে পারবে না।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বলেন, ঈদের পরে আন্দোলন করার হুমকি দিয়েছেন খালেদা-জামায়াত। তাদেরকে বলবো, দেখে যান আজকের লোকসমাগম, দেখলে আন্দোলন করার কথা মুখ দিয়ে বের হবে না।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বার বার ষড়যন্ত্র হয়েছে। শত ষড়যন্ত্রের মধ্যেও আওয়ামী লীগ এগিয়ে গেছে, যাবে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, আহমদ হোসেন, নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুকুল চৌধুরী, শেখ বজলুর রহমান, কামাল আহমেদ মজুমদার, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, আওলাদ হোসেন, মোল্লা মো. আবু কাওসার, শামসুল হক রেজা, আশরাফুন্নেসা মোশাররফ, ফজলুল হক মন্টু, অপু উকিল, এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ, সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ গণশোভাযাত্রায় জনজোয়ার সৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীতে কিছুটা যানজটের সৃষ্টি হয়। এদিকে শোভাযাত্রা পূর্বসমাবেশের শুরুতে মঞ্চের সামনে অবস্থান নেয়াকে কেন্দ করে উপস্থিত ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বরিশাল অফিস জানান, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শোভাযাত্রা বের করে। এর আগে নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বিকালে জেলা আওয়ামী লীগ সোহেল চত্বরে সমাবেশ করে।
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন নগরীতে শোভাযাত্রা ও পৃথক আলোচনা সভার আয়োজন করে।
রাজশাহী অফিস জানায়, নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে।
