রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলা

মুফতি হান্নানসহ ৮ জনের ফাঁসি

আপডেট : ২৩ জুন ২০১৪, ২২:২৪
নববর্ষের প্রথম প্রহরে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলার হত্যা মামলায় ১৩ বছর পর হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। অপর ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত। হত্যা ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ দণ্ড দেয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ৫ আসামি পলাতক রয়েছেন। গতকাল বেলা ১২টায় জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. রুহুল আমিন। রায়ে বলা হয়, এটা কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করাসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত তথা সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করার জন্যই এ বোমা হামলা চালানো হয়েছিলো। রায় ঘোষণার সময় নয় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায়ে আসামি পক্ষ পুরোপুরি সংক্ষুদ্ধ তবে রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির ফাঁসি না হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট নন। এজন্য তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। পাশাপাশি আসামি পক্ষও এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। রমনা বটমূলে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় আদালত অভিযুক্ত আসামি মুফতি আবদুল হান্নান মুন্সী ওরফে আবুল কালাম ওরফে আবদুল মান্নান, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, মুফতি আঃ হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ও মুফতি শফিকুর রহমানকে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০বি ধারায় এবং অভিযুক্ত আসামি মাওলানা তাজউদ্দিন ও আরিফ হাসান সুমনকে একই আইনের ৩০২/৩৪ ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। একইসঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়। আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেয়া হয়। অন্য আসামি হাফেজ মওলানা আবু তাহের, মওলানা সাব্বির ওরফে আবদুল হান্নান, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ এবং মাওলানা আঃ রউফ-কে দণ্ডবিধির ৩২০/১২০বি ধারা এবং শাহাদাত উল্লা ওরফে জুয়েলকে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও পঞ্চাশ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও ১ বত্সর করে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে বর্তমান মামলায় হাজতকালীন মেয়াদ বর্ণিত কারাদণ্ডের মেয়াদ থেকে বাদ যাবে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ৫ জন পলাতক রয়েছেন। এরা হলেন, বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই তাজউদ্দিন, জাহাঙ্গীর, আবু বকর, শফিকুর ও আবদুল হাই। মুফতি হান্নানসহ অপর দণ্ডপ্রাপ্তরা কারাগারে আছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ রায় ঘোষণার আগে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, এই হত্যা মামলা কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। বাঙালি জাতির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিরাও নিরীহ নাগরিক। এ অনুষ্ঠান কোন নির্দিষ্ট দল, মত, গোষ্ঠী, বা ধর্মের ছিলো না। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে জাতি ধর্ম- বর্ণ- গোষ্ঠী, নারী- পুরুষ, ছোট- বড় নির্বিশেষ সকল শ্রেণি পেশার হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল। ঘটনাস্থলে যে দুটি বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিলো তা অনেক আগেই ভোর রাতে কৌশলে পুঁতে রাখা হয়েছিলো। বোমা দুটি টাইম ডিভাইস বা রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে বিষ্ফোরণ ঘটনো হয় বলে বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়া যায়। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বোমা হামলাকারীদের লক্ষ্য কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি, বস্তু বা গোষ্ঠী ছিল না। আয়োজক সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সকাল আটটা ৫ মিনিটে একটি বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ১০/১৫ মিনিট পরে আরো একটি বোমা বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রথম বিষ্ফোরণে ঘটনাস্থলেই ৭ নিরীহ ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং ২০/২৫ জন গুরুতর আহত হন। পরে আহতদের মধ্যে আরো ৩ জন চিকিত্সাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করাসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে কলুষিত তথা সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করার জন্যই এ বোমা হামলা চালানো হয়। বোমা হামলাকারী ও এর পরিকল্পনাকারীদের এই কাজ নিঃসন্দেহে নৃশংস, নির্মম, বর্বর, জঘন্য ও ক্ষমার অযোগ্য। স্বাধীন বাংলাদেশে নৃশংসতম, জঘন্যতম ও বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম এটি। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাই আসামিদের প্রতি অনুকম্পা বা সহানুভূতি দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা উপলক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। র্যাব ও পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতি ছিল। রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক রুহুল আমিন পৌনে ১২টায় এজলাশে আসেন। এরপর সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু করেন। ১৫ মিনিটের মধ্যে রায় ঘোষণা করে তিনি এজলাশ ত্যাগ করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা স্বাভাবিক ছিলেন। আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এসএম জাহিদ হোসেন সরদার জানান, আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। সকল আসামির ফাঁসি হলে খুশি হতাম; কিন্তু আদালত ৬ জনকে যাবজ্জীবন দণ্ড দিয়েছে। এই যাবজ্জীবন দণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হবে। আসামি তাহের ও জুয়েলের আইনজীবী জসীম উদ্দিন বলেন, এই ঘটনায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী সাক্ষ্য দেননি। ভিডিও ফুটেজেও তাহের এবং জুয়েলের কোনো ছবি ছিল না। তাই আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। আকবর হোসেনের আইনজীবী মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা আদালতের কাছে প্রমাণ করেছি- আমার আসামিকে জোরপূর্বক পুলিশের হেফাজতে রেখে জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। আদালত কেবল ওই জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে আমার আসামিকে ফাঁসি দিয়েছে। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনার দিনই নীলক্ষেত বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুইটি মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে হত্যা মামলায় মুফতি হান্নানসহ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। ২০০৮ সালে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। এদের মধ্যে আকবর হোসাইন ২০০১ সালে, মুফতি হান্নান ২০০৬ সালে ও আরিফ হাসান সুমন ২০০৮ সালে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ হামলার দায়িত্বে ছিলেন বলে তারা জবানবন্দিতে স্বীকার করেন। আদালত ২০০৯ সালের ১৬ এপ্রিল অভিযোগ গঠন করেন। ২০০৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলাটি ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত ১৩৫ কার্য দিবসের মধ্যে ৮০ সাক্ষীর মধ্যে ৫০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে। নির্ধারিত সময়ে মামলার বিচার শেষ না হওয়ায় ওই আদালত ২০১০ সালের ২৪ মে বর্তমান আদালতে অবশিষ্ট বিচার শেষ করার জন্য পাঠানো হয়। ওই আদালত গত সাড়ে ৩ বছরে আরো ১১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর (মোট ৬১ জন) গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত করেন। এরপর গত বছরের ১০ নভেম্বর আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় যুক্তিতর্ক। ১৪টি ধার্য তারিখে রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির পর গত ২৮ মে শেষ হয়ে রায় ঘোষণার দিন ঠিক হয়। প্রথমে ১৬ জুন দিন ধার্য থাকলেও রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ওইদিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। পরে ২৩ জুন দিন ধার্য করে আদালত। ধার্যকৃত দিনে গতকাল এ রায় ঘোষণা করা হলো। বিস্ফোরক আইনের মামলা এ ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে দায়েরকৃত আরেকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ওই মামলা সম্পর্কে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পিপি আবু আব্দুল্লাহ ভুঁইয়া জানান, বিস্ফোরক আইনের মামলাটি হত্যা মামলার সঙ্গে বিচারের জন্য ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তার ট্রাইব্যুনাল সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি মতামত পাঠায়; কিন্তু সোমবার পর্যন্ত ওই ব্যাপারে রেজিস্ট্রারের কার্যালয় কোন নির্দেশনা দেয়নি। এখন যেহেতু হত্যা মামলা রায় হয়ে গেল তাই আমরাও এ মামলার বিচার শুরুর উদ্যোগ নেব।