সকালে ভারী বর্ষণ ও দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিতে গতকাল সোমবার তলিয়ে যায় রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক। সড়কের বাইরে বিভিন্ন নিচু স্থানেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই জলজট আর দুপুরের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শোভাযাত্রার কারণে সড়কে সৃষ্ট তীব্র যানজটে সারাদিনই ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে। কর্মস্থলে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করা মানুষের জন্য স্বাভাবিক চলাফেরা করাটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ পূর্বাভাস প্রদানকারী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে জানান, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর আগে গত রবি, শনি ও শুক্রবার যথাক্রমে ২৫ মিলিমিটার, ১৩ মিলিমিটার ও ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। আগামী দুইদিনও একই আকারে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, নগরীতে ওয়াসার পানি নিষ্কাষণের যে ২৯০ কিলোমিটার ব্যবস্থা রয়েছে সেই ড্রেনেজ লাইনগুলোয় ঘন্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টি ধারণ করতে পারে। অথচ বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এখন প্রতিদিন গড়ে ১০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন না ঘটলে বৃষ্টিপাতে নাগরিক দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়বে।
গতকালের বৃষ্টিতে রাজধানীর মালিবাগ, মৌচাক, শান্তিনগর, মগবাজার, মুগদা, কাজলা, শ্যামপুর, জুরাইন, ডেমরা, পোস্তগোলা, ফরিদাবাদ, মিরপুরের রোকেয়া সরণী, আজিমপুরের নিউপল্টন, মানিকনগরসহ নিচু এলাকাগুলোতে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতা তৈরি হয়- রামপুরা, বাসাবো, গোড়ান, মতিঝিল, পুরানা পল্টন, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, নিমতলী, আশেক লেন, আলাউদ্দিন রোড, নাজিমউদ্দিন রোড, বকশিবাজার, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, গুলশান, বারিধারা, বাড্ডা, রায়সাহেব বাজার, মৈশুন্ডি, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, নয়াবাজার, মিডফোর্ড, লালবাগ ও গেন্ডারিয়ার বিভিন্ন এলাকায়। সকালে পানি জমে সচিবালয়ের সামনের রাস্তায়ও। এ স্থানগুলোর কোথা কোথাও বিকাল নাগাদ জলাবদ্ধতা কাটলেও অধিকাংশ এলাকাতেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এলাকাগুলোর সরু পথে-গলিতে জলাবদ্ধতা ছিল রাতেও।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আরো বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে বলেই মনে করছেন নগরবাসী। পুরান ঢাকার বনগ্রাম, শশীমোহন বসাক লেন, উত্তর মৈশন্ডি, লালবাগ, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ি, ধলপুর এবং হাজারীবাগের অনেক রাস্তায় রাত পর্যন্ত পানি সরেনি। একই অবস্থা মালিবাগ-মৌচাক, মানিকনগর, গুলশান-শাহজাদপুরের বেশ কিছু রাস্তায়। বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকার বাসিন্দারা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। কর্মস্থলে আসা-যাওয়া করা বিভিন্ন পেশাজীবী এবং স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা বিপাকে পড়েন। অনেকে হাঁটু পানি ভেঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছান। এছাড়া বেশি বিপদে পড়েন শ্রমজীবী মানুষ। মানিকনগর, মিরপুর ও আজিমপুরের নিচু এলাকার ঘরে বিশেষত বস্তির ঘরে পানি প্রবেশ করায় গরিব মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে বহুগুণ।
এ প্রসঙ্গে গতকাল বিকালে মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা যুবায়ের আহমেদ বলেন, জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ আমাদের জীবনের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালে মতিঝিলে অফিসে যাওয়ার জন্য প্রায় দেড় ঘন্টা আগে বেরিয়েছি। ময়লা-পানি ঠেলে অফিসে পৌঁছতে এরপরও আধা ঘন্টা দেরি হয়েছে। এখন অফিস থেকে বেরিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য বাস পাচ্ছি না। কখন বাসায় পীেঁছিব, বুঝতে পারছি না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা এক রোগীর স্বজন রোজিনা বেগম বলেন, পুরান ঢাকার নয়াটোলা এলাকায় জলাবদ্ধতাসৃষ্ট দুর্ঘটনায় তার এক আত্মীয় রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে অনেক বেশি সময় লাগায় পায়ের জখমে সংক্রমণ হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এ জলাবদ্ধতা আর কত দিন থাকবে।
যে কারণে জলাবদ্ধতা
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকায় জলাবদ্ধতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। এছাড়া প্রতিবছর কার্পেটিং করার কারণে অধিকাংশ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উঁচু হচ্ছে। ফলে বসতিগুলো নিচু হয়ে যাচ্ছে। নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত বলে তারা জানান।
জানা গেছে, ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় ওয়াসা ও ডিসিসি ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ (এলজিইডি) বেশ কিছু সংস্থা কাজ করছে। এর মধ্যে ডিসিসি ও ওয়াসার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ডিসিসি ও ওয়াসার কাজে বরাবরই ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। দুই ডিসিসি বলতে গেলে অভিভাবকহীন। ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এখনো ভালোভাবে পানি নিষ্কাশন পাম্প স্থাপন করেনি। তবে কল্যাণপুর ও নারিন্দায় ওয়াসার স্থায়ী নিষ্কাশন কেন্দ্র রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানীর রাস্তাগুলোর দুই ধারে ডিসিসির ভূ-উপরিস্থ প্রায় আড়াই হাজার নর্দমার বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার করা হয় না। এ কারণে ওয়াসার নিষ্কাশন নালা-নর্দমাও ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ এলাকার নর্দমায় পলিথিনসহ অন্যান্য বর্জ্য জমছে। ডিসিসি সময়মতো সেগুলো পরিষ্কার না করায় ওয়াসার ভূগর্ভস্থ নর্দমায় গিয়ে তা পড়ছে। বর্ষা আসার আগেই রাজধানীর সব ধরনের নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং খালগুলো পুরোপুরি খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করলে এই জলাবদ্ধতার হাত থেকে হয়তো রক্ষা পাওয়া যেত।
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ড্রেনেজ সার্কেল) জাকি মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, আমরা সাধ্যমত ড্রেনেজ লাইনগুলো পরিষ্কার রাখি। তারপরও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নগরীর নিন্মাঞ্চলে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ড্রেনেজ মাস্টার প্লান্টের কাজ চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আশা করা যায় আগামী এক বছরের মধ্যে রাজধানীর জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি ড্রেনগুলোতে আবর্জনা না ফেলে নির্ধারিত ডাস্টবিন ব্যবহারের জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
