একে একে চলে গেছে ১৩টি বছর। একটা সময় ধরে নিয়েছিলাম বিচার পাব না। মামলার তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যেন বিচার চাওয়াটাই ছিল আমাদের অপরাধ। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ২০০৭ সালে আবার মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলার রায় ঘোষণার পর গতকাল সোমবার প্রতিত্রিয়া জানানোর সময় একথা বলেন পটুয়াখালীর বাউফলের দীঘিরপাড় গাজী পরিবারের সদস্যরা। বোমা হামলায় এই গাজী পরিবারের তিন ভাইবোন নিহত হয়েছিল। এরা হলেন কাশেম গাজীর ছোট ছেলে আল মামুন, শামসুল হক গাজীর বড় ছেলে রিয়াজ এবং হাসেম গাজীর ছোট মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পী।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে বোমা হামলায় ঘটনাস্থলে মারা যায় ১০ জন। নিহত একজনের পরিচয় জানা যায়নি। তবে পুলিশের ধারণা নিহত অজ্ঞাত যুবক ছিল বোমা বহনকারীদের একজন।
নিহত আল মামুনের বৃদ্ধ বাবা কাশেম গাজী বলেন, স্বজন হারানোর কষ্টটা দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াচ্ছিলাম। এ দীর্ঘ পথে আমাদের কেউ আসেনি সান্ত্বনা দিতে। তবে বৈশাখ এলে শুধু সাংবাদিকেরাই আমাদের খবর নিত। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর পর গতকাল বিচারের রায় শুনে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। কষ্টের বোঝাটা অনেক কমেছে। বিচার কাজ সমপ্ত করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
মামুনের ছোট ভাই সাদ্দাম গাজী বলেন, ‘স্বজনদের আর ফিরে পাবে না। তবে ঘাতকের বিচার হয়েছে আমরা তাতেই খুশি। তবে দ্রুত বিচারের রায় কার্যকর দেখতে চাই।’
নিহত শিল্পীর বৃদ্ধ বাবা হাসেম গাজী মেয়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন ,তার তিন ছেলে ও চার ছেলের মধ্যে শিল্পী ছিল সবার ছোট। তার মৃত্যুর খবর পাওয়া পর থেকে তার মা শোকে নির্বাক হয়ে যান। মেয়ে হারানোর শোক নিয়ে ২০০৬ সালে সে মারা যায়। মেয়ের কথা বলতে বলতে এক সময় তার কথা আটকে যায়। এক পর্যায় তিনি বলেন, ভেবেছিলাম জীবদ্দশায় মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বিচারের রায় হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত এ রায় কার্যকর হবে।
নিহত শিল্পীর ভাই মোশারফ হোসেন গাজী বলেন, কাছিপাড়া ডিগ্রি কলেজে পড়তো শিল্পী। সে ছিল সংস্কৃতি মনা। পড়াশুনায় ছিল মেধাবী। মায়ের ইচ্ছা ছিল সে উচ্চতর ডিগ্রি নেবে। কিন্তু মায়ের সে ইচ্ছা ছিন্ন ভিন্ন করেছে জঙ্গিদের বোমা। যাক দীর্ঘদিন পর বিচারের রায় ঘোষণায় আমরা মানসিকভাবে অকেটা শান্তি পাচ্ছি।
নিহত আল মামুনের বড় ভাই মোহাম্মদ এরশাদ গাজী বলেন, নিহত আল-মামুন ছিল তার আপন ভাই। আর রিয়াজুল ও জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পী তার চাচাতো ভাইবোন। শিল্পীর বড় ভাই হাবিবুর রহমান ঐ সময় থাকতেন ফার্মগেট এলাকায় তার বাসাতেই বেড়াতে গিয়েছিল শিল্পী। আর ঐ সময় রিয়াজুলের বাবা সামসুল গাজীর (বড় চাচা) ওষুধের দোকান ছিল মোহাম্মদপুরের কলেজ গেট এলাকায়। তবে রিয়াজ বাবার দোকানে বসতো। ছেলেকে হারাবার পর তিনি দোকান বিক্রি করে দেন।
অপরদিকে আর আল মামুন ও শিল্পী থাকতো গ্রামের বাড়িতেই। কয়েকদিন আগে আল মামুন ও শিল্পী ঢাকায় বেড়াতে যায়। ঘটনার দিন তিন ভাইবোন এক সঙ্গে বটমূলে গিয়েছিল। বোমা বিস্ফোরণে তারা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পরে হাসপাতাল মর্গে গিয়ে তাদের লাশ সনাক্ত করা হয়।
