ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবলের সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিক কিংবা খেলা দেখতে আসা দর্শকরা বড় সমস্যায় পড়েছেন। ব্রাজিলের লোকজন পর্তুগিজ ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা বলতে পারেন না। অনেক দেশে ইংরেজি না বুঝলেও ইয়েস, নো, ভেরিগুড বলে চালিয়েদেন তারা। কিন্তু ব্রাজিলিয়ানরা একটাও বুঝতে পারেন না। আর এই নিয়ে ব্রাজিলে আসা বাইরের দর্শক এবং সাংবাদিকরা বিপদেই আছেন।
আবাসিক হোটেলগুলোতে গেলে কথা বলা কঠিন হয়ে যায়। একটা বললে আরেকটা বোঝে। মূক ও বধিররা যেভাবে ইশারায় মনের ভাব প্রকাশ করেন, এখানেও সেভাবে বলতে হয়। না হলে ওরা ইন্টারনেটে পর্তুগিজ ভাষা লিখে সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দেয়। ট্যাক্সি ড্রাইভার পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলেন তার মোবাইলে সেটা সেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনুবাদ করে শুনিয়ে দিলে বোঝা যায় ড্রাইভার কি বলতে চাইছে।
বেলে হরািইজন্তে থেকে রবিবার ভোরে ব্রাসিলিয়ায় পৌঁছানোর পর হোটেল খুঁজতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে সাংবাদিকরা। ট্যাক্সি ড্রাইভার স্টেডিয়াম থেকে ১০ মিনিট দূরত্বের পথে একটা হোটেলে নিয়ে যায়। রিসিপশনের ভদ্রমহিলা একেবারেই কথা বোঝেন না। ড্রাইভারের সহযেগিতা নিয়ে ইশারায় বোঝানোর পর তিনি বুঝলেন। বললেন, রুম লাগবে ভাড়া এতো টাকা। সব কিছু চূড়ান্ত করে চার সংবাদিক দ্রুত স্টেডিয়ামের মিডিয়া সেন্টারে যান ঢাকায় নিউজ পাঠানোর জন্য। ঢাকায় নিউজ পাঠানোর সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। রাত ৯টায় হোটেলে ফেরার পর দেখ গেল হোটেলের মালিক ৫০ বছর বয়সের মহিলা আমাদের দেখেই ক্ষেপে আগুন। তিনি দেখা মাত্রই ইংরেজিতে রুমের চাবি ফেরত চাইলেন। ‘কোনো কথা নেই চাবি ফেরত দাও।’ কিন্তু কেন ? রাগে উত্তেজিত মহিলা বললেন, চাবি ফেরত দেবে ? নাকি পুলিশ ডাকবো? চাবি ফেরত দেয়া হলো। চাবি হাতে নিয়ে বললেন এবার বেরিয়ে যাও। সাংবাদিকরা বললেন, কোথায় যাবো এতা রাতে? সব কিছু বন্ধ এখানে। সমস্যাটা কি- প্রশ্ন করতেই মিহলা আরো রেগে গেলেন। সবাই তাকে ‘কুল কুল’ বলে শান্ত করতে চাইলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মহিলার অভিযোগ সংবাদিকরা রুমে ব্যাগ রেখেই চাবি পকেটে নিয়ে চলে গেছেন। তারা পরিচয় দেননি। কোথা থেকে এসেছেন- তা জানানানি। কি কারণে ব্রাসিলিয়ায় এসেছেন তা জানাননি। কোনো পরিচয় পত্র না দিয়ে ব্যাগ রেখে চলে গেছেন। উনি বলছেন, ‘আমি সারাদিন টেনশনে ছিলাম। ব্যাগের ভেতরে কী আছে- সেটা জানি না।’ ব্যাগ এনে নিচে রাখা আছে, নিয়ে চলে যাও। তাকে বলা হল খেলার নিউজ পাঠানোর কারণে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। উনি বলেন, তোমরা কি নেইমার, নাকি দানিয়েল আলভেস? খেলতে এসেছো ? তামাদের আমরা চেনা আছে।’ সাংবাদকিরা এই ভুলের জন্য বার বার দুঃখ প্রকাশ করলেন। তার পরও ভদ্রমহিলার রাগ একটুও কমছিল না। উনি বার বার বলছেন, বেরিয়ে যাও। না হলে পুলিশ ডাকবো। বাইরে অনেক হোটেল খোলা আছে সেখানে যাও। ততক্ষণে রাত ১০টা বেজে গেছে। এলাকাটা একেবারেই নিস্তব্ধ। অন্য হোটেলেও একই সমস্যা। কথা বোঝানো যায় না, বোঝাও যায় না। এদিকে বুড়ি তো কথাই শুনছেনই না। সৃষ্টি কর্তার রহমতে একজনের চেষ্টায় বুড়ি কিছুটা শান্ত হন। রুমে যাওয়ার অনুমতি দেন। হাসিখুশি মুখে কথা শুরু হলো। সংবাদিকরা মহিলারে কাছে জানতে চাইলেন কোথায় খাবার ব্যবস্থা আছে। ৫ মিনিট আগের অগ্নিমুর্তি ধারন করা মহিলা নিজেই সবাইকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন হোটেলে। নিজে খাবারের অর্ডার দিলেন। কোনটা খেলে ভালো লাগবে সেটার অর্ডার দিলেন। জুস ভালো না শরবত ভালো হবে তাও বলে দিলেন। সবাই তো অবাক! কিছুক্ষণ আগের মহিলাই কিনা এই মারি কি সেই মারি করে তেড়ে আসছিলেন। খাওয়ার মাঝে মাঝে নিজেই খাবার তুলে দিচ্ছেন প্লেটে। দুই কন্যা আর নাতিদের সম্পর্কে গল্পও জুড়ে দিলেন। মোবাইল ফোন থেকে ছবি দেখালেন আর নাতির দুষ্টমির কথা বললেন মজা করে। খাওয়া শেষে বিল আনতে বলা হলো। লেটুস পাতা, গাজর, টমেটো, কলা, মেয়োনিজ, চার গ্লাস শরবত, দুই প্লেট ভাত, দুই প্লেট মাছ, চার জনের বিল হলো প্রায় ১৭ হাজার টাকা। ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, খাওয়া কেমন হয়েছে ? টাকার শোক ছেড়ে সবাইকে বলতে হল, দারুন, দারুন!
