ফুটবল খেলা

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ১৯:২৭
টিএসসিতে রাজু ভাস্কর্য। মোড়েই বিশাল স্ক্রিনে ছাত্ররা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখছে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলা চলছে। পাশের গাছে বসে খেলা দেখছে তিনটি বানর। গাছের একেবারে নিচের ডালে তারা বসে আছে। ছাত্ররা তাদের তাড়াচ্ছে না। বরং কেউবা তাদের কলা দিচ্ছে, কেউবা বাদাম দিচ্ছে। তারাও মজা করে খাচ্ছে। সেদিন খেলা শেষ হয়ে গেল। সকলে চলে গেল। বানর তিনটিও চলে গেল। পরেরদিন বিকেলে দোয়েল চত্বরের পাশেই গাছে বানর তিনটি বসে আড্ডা দিচ্ছে। হঠাত্ একটি বানর দেখতে পেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুইমিং পুলের পাশে খেলার মাঠে ছাত্ররা ফুটবল খেলছে। সাথে সাথেই তিনজন গাছ থেকে নেমে গেল। সুইমিং পুলের উপর বসে মহানন্দে ফুটবল খেলা দেখছে। একপর্যায়ে লং কিক দেয়ায় ফুটবলটি মাঠের বাইরে এসে পড়ল। গড়িয়ে গড়িয়ে সুইমিং পুলের কাছেই এসে থেমে গেল। সাথে সাথেই একটি বানর একলাফে সুইমিং পুল থেকে নেমে গেল। বলটি নিয়ে তাড়াতাড়ি পাশের গাছের মগডালে উঠে চুপ করে বসে রইল। এদিকে ছাত্ররা অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোথাও বলটি না পেয়ে চলে গেল। সেদিন আর তাদের খেলা হলো না। পরেরদিন দুুপুরে পুরোনো ঢাকার বানরসহ অনেকগুলো বানর খেলার মাঠে হাজির। তাদের সাথে একটি ফুটবল। আগের দিন যে ফুটবলটি তিনটি বানর নিয়েছিল সেটি তাদের সাথে। তারা সকলে মিলে ফুটবল খেলবে। কিন্তু সমস্যা হলো বানরেরা তো ফুটবল খেলার নিয়ম-কানুন জানে না। কিভাবে তারা খেলবে। তিনটি বানর বুদ্ধি করলো কাউকে রেফারী বানানো যায় কিনা। আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল সুইমিং পুলের পাশে গাছের ছায়ায় সৌম্যসুন্দর সাদা চুল-দাড়িঅলা একজন বসে খাতায় কি যেন লিখছে। বানর তিনটি কাছে গিয়ে দেখতে পেল একজন কবি বসে কবিতা লিখছেন। একটি বানর সামনে এগিয়ে বললো- নমস্কার দাদা, কেমন আছেন। আমরাতো আপনার কবিতার ভক্ত। প্রতিবছর একুশে বইমেলার সময় আপনার কবিতার আবৃত্তি শুনি। আপনার স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা কবিতাটা এখনো আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। কবিতো অবাক! এই বানরগুলো কথা বলছে, আবার তাঁর কবিতার কথা বলছে। কৌতূহলী হয়ে কবি জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা এত বানর এ খেলার মাঠে কেন? তোমাদের তো গাছে গাছে থাকার কথা। একটি বানর বললো— আর বলিয়েন না দাদা, বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে দেখতে আমাদেরও ফুটবল খেলার শখ জেগেছে। তাই আজ আমরা সকলে মিলে ফুটবল খেলব। কিন্তু দাদা সমস্যা হলো আমরা বানরাতো ফুটবল খেলার নিয়ম-কানুনতো জানি না। কে আমাদের খেলার নিয়ম-কানুন শেখাবে, কেইবা আমাদের রেফারি হবে। দাদা আপনি যদি আমাদের আজকের খেলায় রেফারির দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে আমরা সারাজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকতাম। বানরদের এই মিনতি দেখে কবি তাদের ফেরাতে পারলেন না। কবি বললেন- ঠিক আছে আমি তোমাদের খেলার রেফারি হতে রাজি হতে পারি, তবে একটি শর্ত আছে। আর এই শর্তটি হচ্ছে আমার সিদ্ধান্ত তোমাদের অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিতে হবে এবং খেলা নিয়ে তোমরা কোন মারামারি করতে পারবে না। বানরেরা কবিকে আশ্বস্ত করলো তারা কোনো মারামারি করবে না। কবি আশ্বস্ত হয়ে রেফারি হওয়ার জন্যে রাজি হয়ে গেলেন। কবি মাঠে গিয়ে দেখেন পঞ্চাশ-ষাটটি বানর লাফালাফি করছে। কবি জিজ্ঞেস করলেন কে কে খেলবে। সকল বানর বললো- তারা সবাই খেলতে ইচ্ছুক। দাদা বললেন- না ফুটবল খেলার নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আছে। প্রতিপক্ষে তোমরা এগারজন করে দু’পক্ষে মোট বাইশজন খেলতে পারবে। এখন তোমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নাও কোন বাইশজন খেলবে। এবার দেখা গেল সকলেই খেলতে ইচ্ছুক কেউ ছাড় দিতে চাচ্ছে না। দেখা গেল বানরেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কে খেলবে কে খেলবে না। কবি বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি আমাকে রেফারি হিসেবে মান। সকলেই একবাক্যে বললো, মানি। কবি বললেন, যদি আমাকে রেফারি হিসেবে মান্য করো তবে আমি তোমাদের থেকে যে বাইশজনকে বাছাই করবো তারাই শুধু খেলতে পারবে। বাকিরা মাঠের বাইরে বসে দর্শক হয়ে খেলা দেখবে। এই বলে কবি একজন একজন করে বাইশজনকে আলাদা করে নিলেন। সেখান থেকে এগারজন এগারজন করে দু’ভাগ করলেন। এমন সময় একটি পিচ্চি বানর এসে বললো, দাদা আমিতো পিচ্চি, আমার খুব ইচ্ছা ফুটবল খেলি। পিচ্চি বানরটা কবির ক’টি কিশোর কবিতা আবৃত্তি করে শোনালো। কবি তো অবাক, তাকে তো খেলতেই দিতে হবে। বাইশজন থেকে একটি বৃদ্ধ বানরকে কাছে ডেকে বললেন, তুমিতো জীবনে অনেক খেলাধুলা-লাফালাফি করেছো। আজকে তুমি এই পিচ্চি বানরটাকে খেলার সুযোগ করে দিয়ে তুমি দর্শক হয়ে মাঠের বাইরে খেলা দেখতে হবে। কবির এই কথা শুনে বুড়ো বানরটাতো মহাক্ষেপে গেল, বললো— আমি মাঠে কোনদিন ফুটবল খেলিনি, আজ সুযোগ হয়েছে খেলার, এটাই হয়তো শেষ সুযোগ, দু’দিন পরতো মরেই যাব। এই পিচ্চি বানরটাতো বড় হয়ে জীবনে অনেক সুযোগ পাবে ফুটবল খেলার। না আমি মাঠের বাইরে যাবো না। বুড়ো বানরের এই কথা শুনে যে তিনটি বানর ফুটবল নিয়ে এসেছিল তারা বললো, দেখ বুড়ো মামা তুমি যদি আজ এই পিচ্চিটাকে খেলতে না দাও তাহলে আমরা ফুটবল নিয়ে চলে যাব, আজ কোন খেলাই হবে না। এদের কথাবার্তা শুনে মাঠের বাইরের বানরগুলো এসে তিনজনের কাছ থেকে ফুটবলটি কেড়ে নিল। না বুড়োকে আজ খেলতে দিতেই হবে। এদের এ কথা শুনে আরেকদল বললো- না পিচ্চিকেই খেলতে দিতে হবে। কবি এদের ধমক দিয়ে থামাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু কেউ থামছে না— তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। সবকিছু দেখে এদের একটা বকা দিয়ে মাঠ ছেড়ে চলে গেলেন, কেউ কবিকে ফেরাতে পারলো না। কবি চলে যাওয়াতে বুড়ো বানরের জন্যেই এই অবস্থা বলে কিছু বানর বকাঝকা করতে লাগলো। এককথা দু’কথা থেকেই বানরেরা দু’ভাগ হয়ে গেল, এদের মধ্যে তুমুল মারামারি। কেউ ফ্লাইং কিক মারছে, কেউ খামচি দিচ্ছে, কেউ লেজ ধরে একজন আরেকজনকে আছাড় মারছে। প্রচণ্ড মারামারিতে বিশ-পঁচিশজন বানর আহত হয়ে মাঠে পড়ে রইল। বাকিরা পালিয়ে গেল। এদিকে বিকেলবেলায় ছাত্ররা খেলার মাঠে এসে দেখে অনেকগুলো বানর আহত হয়ে পড়ে আছে। সকলে মিলে একটি ট্রাকে করে আহত বানরগুলোকে পশু হাসপাতালে নিয়ে গেল। সুচিকিত্সা পেয়ে সাতদিনের মধ্যেই সকলে সুস্থ হয়ে গেল। এবার সুস্থ বানরগুলোকে নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিপাকে পড়ে যায়, এদের কি করা যায়। এদের উত্পাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিষ্ঠ। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় বানরগুলোকে মিরপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। যথারীতি তাদের চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এখন চিড়িয়াখানার বিশাল নেটের খাঁচায় এদের বন্দি জীবনযাপন চলে। খাবার-দাবারের কোনো অভাব নেই, কিন্তু ইচ্ছেমতো বনে-বাঁদাড়ে গাছে গাছে ঘোরাফেরা করতে পারে না। এ ঘটনার পর বানরকুল আর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে পারেনি এবং নিজেরাও খেলতে পারেনি।