দুনিয়া মাতানো বিশ্বকাপ প্রখ্যাত গবেষক, প্রবন্ধকার ও ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খানের লেখা একখানি চমত্কার গ্রন্থ। এই গ্রন্থটিতে রয়েছে ফুটবলের ইতিহাস, আমাদের উপমহাদেশে কিভাবে ফুটবল খেলা শুরু হয় তার কথা, ফিফার কাহিনী, ফিফার প্রথম বাঁশি, দুটি স্মরণীয় বিশ্বকাপের ধারাভাষ্য, টাগাবুয়েগা ও মাস্টার পিসের কথা, বেকেনবাওয়ারের রণনীতি ও কৌশল, পেনাল্টির বিশ্বকাপ, ব্রাজিলের হারার কাহিনী, ম্যারাডোনা, নব্বইয়ের বিশ্বকাপ— ইতালি বিশ্বকাপের সেরা খেলা, বিশ্বকাপের ওলট-পালট, বিশ্বকাপের স্মরণীয় খেলা, বিরাশির বিশ্বকাপ ও বিশ্বকাপ-২০১০-এর কথা। বইটির সর্বশেষে রয়েছে ১৯৩০ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের খেলার চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ, তৃতীয় ও চতুর্থস্থান দখলকারী দলের বিবরণ। বইটির মধ্যভাগে রয়েছে ২০১০-এ অংশগ্রহণকারী দলের আলাদা ও একত্রে খেলোয়াড়দের রঙিন ছবি।
ফুটবলের ইতিহাস তথা বিশ্বকাপ ফুটবলের নানা তথ্য-উপাত্ত জানার জন্য এ ধরনের বই ১৯৮৭ সালের আগে রচিত হয়নি। তখন ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের নানা তথ্য দিয়ে প্রথম এটি ছাপা হয় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত কিশোর পত্রিকা ধানশালিকের দেশ পত্রিকা। লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এবং ১৯৮৭ সালে একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৮ সালে বইটি শিশু একাডেমি আয়োজিত অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কারও লাভ করে। ১৯৯৪ সালে বইটি আবার বাংলা একাডেমি দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। তখন বইটির আকার ছিলো বড়ো এবং ছবিগুলো রঙিন। বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে শব্দ শিল্প প্রকাশনা থেকে। বিশ্বকাপ ২০১৪ উপলক্ষে বইটির চতুর্থ সংস্করণ দু’একদিনের মধ্যে প্রকাশিত হবে।
শিশু-কিশোর এবং বড়োদের কাছে বইটির এতো চাহিদা ও পাঠকপ্রিয়তা নিয়ে কথা হলো সেদিন শামসুজ্জামান খানের সাথে। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম— আপনাকে আমরা জানি একজন ফোকলোরবিদ এবং বাংলাদেশে ফোকলোর চর্চার অন্যতম পথিকৃত্ হিসেবে। আপনি এ ধরনের একটি বই লিখতে আগ্রহী হলেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন— টেলিভিশনে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ খেলা দেখার পরে নিজের প্রচণ্ড আগ্রহ জাগে এ ধরনের একটি বই লেখার। আমি কৈশোর থেকেই ফুটবলপ্রিয়। বলতে পারো ফুটবল পরিবারের সন্তান। আমার বাবা মাহমুদুর রহমান খান ছিলেন ফুটবলপ্রিয়। তিনিও ফুটবল খেলতেন। আমার প্রপিতামহ আক্রামুজ্জামান খানও ছিলেন ফুটবলপ্রিয়। তাঁর কথা পরে বলি। আমাদের গ্রামের নাম চারিগ্রাম। এটি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় অবস্থিত। আমাদের গ্রামে সেকালে ছিলো সিওয়াই স্পোর্টিং ক্লাব (চারিগ্রাম ইয়ং স্পোর্টিং ক্লাব)। এই ক্লাবটি প্রতিবছর ফুটবল খেলার আয়োজন করতো। আমিও খেলতাম। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ফুটবল খেলার নিয়মিত অংশ নিয়েছি। শুনলে তুমি অবাক হবে— সেকালে কলকাতায় আমাদের গ্রামের নামে গঠিত সিওয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের একটি দল ছিলো।
হ্যাঁ যা বলছিলাম— আমার প্রপিতামহ আক্রামুজ্জামান খানের কথা। তিনি এ জেড খান নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯২৯ সালে আজকের গোপালগঞ্জ জেলার মহাকুমা প্রশাসক ছিলেন। তখন গোপালগঞ্জ শহরে ফুটবল খেলা অনেকেই পছন্দ করতেন। একবার তিনি নিজের নামে ‘এ জেড খান শিল্ড’ ঘোষণা করলেন। চারদিকে আনন্দ, হৈ-হৈ-রৈ-রৈ কাণ্ড ও উত্তেজনা। ফুটবলের এই আয়োজনে মহকুমাবাসী ভীষণ খুশি। চূড়ান্ত খেলার দু’টি দল। একটি সরকারি দলের পক্ষে শেখ লুত্ফর রহমান, অন্যটি তারই ছেলে খোকার দল। তখন গোপালগঞ্জ নতুন শহর। আশেপাশের গ্রামের লোক ছুটে এলো খেলা দেখতে। পাঁচদিন ড্র হলো। অবশেষে পিতার দলের কাছে খোকার দলের পরাজয় হলো। এই খেলার একমাত্র উদ্যোক্তা ছিলেন আমার বাবার দাদা আক্রামুজ্জামান খান।
খোকাকে চিনতে পারছো তো? খোকা হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর শেখ লুত্ফর রহমান তার বাবা। বঙ্গবন্ধু কিন্তু ফুটবল খেলার এই কাহিনী তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন। তোমাকে জানিয়ে রাখি— ক্রিকেট খেলাও আমার বেশ প্রিয়। তবে ফুটবল খেলা দেখে বেশি আনন্দ পাই। একসময় খেলতাম। আমার বইটি তোমাদের ভালো লেগেছে— এখানেই আমার সার্থকতা।
খালেক বিন জয়েনউদদীন
