নিজে যাকে বড় বলে বড় সে-ই হয়!

আপডেট : ২৮ মে ২০১৯, ২১:৩০

বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অনেক হৈ-চৈ করছে। প্রথাগত ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন এই মানুষেরা বিষয়টির গভীরে না গিয়ে অকারণেই শোরগোল সৃষ্টি করছে। আরে বাবা, কোথাকার কোন্ প্রতিষ্ঠান কী একটা তালিকা তৈরি করলো, সেই তালিকায় কাকে রাখলো আর কাকে রাখলো না, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কী আছে? তালিকায় থাকলেই আমরা ভালো, আর না থাকলেই খারাপ-এমন ধারণা অজ্ঞতার প্রকাশ। কেবল স্বীকৃতি, কেবল নথিভূক্ত হওয়া, কেবল পুরস্কার পাওয়াটাই কি জীবনে সব? যারা নোবেল কিংবা বুকার পায় না, তারা কি সাহিত্যিক নন? কেউ অস্কার না পেলে কি ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী বলে বিবেচিত হবেন না? যারা একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক পান না, তারা কি দেশের সম্মানিত নাগরিক নন?

লেজ ছাড়া হয়তো বানর হয় না, কিন্তু একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় না থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উন্নত বা শ্রেষ্ঠ মানের হবে না—এটা কি যুক্তিসঙ্গত? যারা এ ধরনের তালিকা বা র্যাঙ্কিং করে, তারা যে সব ফেরেস্তা, নিয়মনীতি মেনে, যথাযথ যোগ্যতা বিচার করে এই র্যাঙ্কিং করেছে, এমন গ্যারান্টিই বা কে দেবে?

পাউন্ড না দেয়ার কারণেই বিশ্ব র্যাঙ্কিং থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি পরিস্কার বাংলায় বলেছেন, জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থার আর্থিক দাবি মেটাতে না পারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আসেনি।

মাননীয় অধ্যাপক আরো বলেছেন, ‘পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, প্রতিযোগিতা করেই শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হতে চায়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে র্যাঙ্কিংয়ের প্রয়োজন নেই।’

অধ্যাপক মহোদয় ঠিকই বলেছেন। আমাদের র্যাঙ্কিংয়ের দরকার নেই। আমরা র্যাঙ্কিং ছাড়াই বেশ আছি, ভালো আছি। এখানে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীর কোনো ঘাটতি নেই। বরং এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য এখনো শিক্ষার্থী কী চেষ্টাই না করে! অনেকে এমনও আছে যে পারলে এখানে সন্তানকে ভর্তির জন্য কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে প্রস্তুত। আমরা আমাদের মতো লেখাপড়ার মান, জ্ঞান উত্পাদন ও গবেষণার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ বলতে পত্রিকায় লেখা কলামকে বুঝি। আমরা পিএইচডি বলতে, বিদেশিদের গবেষণাকে নিজের নামে চালিয়ে দেয়াকে বুঝি। সৃজনশীল মানুষ গড়তে আমরা মূলত এমন একটি সমাজ গড়তে চাচ্ছি যেখান ‘সহমত ভাই’ বলে নিজেদের জ্ঞানের চর্চা সেরে ফেলছি। সস্তায় চা-সিঙ্গাড়া-সমুচা বিক্রিতে দক্ষতা অর্জন করেছি। আমরা নীল-সাদা-গোলাপি দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষক রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছি। জ্ঞানের চেয়ে রাজনীতির জোর আমাদের অনেক বেশি। আমাদের এখানে ছাত্ররা যেভাবে রাজনীতি করে, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যে রকম সম্মান-মর্যাদা ভোগ করে, পৃথিবীর অনেক দেশের রাজনীতিবিদরাও তা পায় না। এসব ক্ষেত্রে আমরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এসব ব্যাপারে আমাদের মানে দুনিয়ার আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আছে?

এখন যুগ বদলেছে। বদলেছে মূল্যবোধ, চিন্তা বিশ্বাস। একসময় এদেশে প্রাচীন কবিরা লিখেছেন: ‘আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয়/ লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।/ বড় হওয়া সংসারেতে কঠিন ব্যাপার/ সংসারে সে বড় হয়, বড় গুণ যার।/গুণেতে হইলে বড়, বড় বলে সবে/বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে’’। (বড় কে- হরিশচন্দ্র মিত্র)।

এখন আমরা এই কবিতা বদলে দিয়েছি। আমরা লিখছি, ‘নিজে যাকে বড় বলে বড় সে-ই হয়। লোকে কাকে কী বলিল শুনিবার নয়।’

পুরানো কবিতা বদলে দিয়ে আমরা আমাদের মতো করে বলছি, ‘আপনাকে বড় বলে, বড় সেই হয়/লোকে যারে বড় বলে বড় সেই নয়।/বড় হওয়া সংসারেতে সহজ ব্যাপার/সংসারে সে বড় হয় ছোট গুণ যার।/গুণে হইলে ছোট, বড় বলে সবে/ছোট যদি হতে চাও, বড় হও তবে।’

হ্যাঁ, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের বদলে যেতে হবে। নিজেদের মতো করে সবকিছু ভাবতে হবে। আগে নিজেকে নিজে বড় ভাবতে হবে। লোকে কি বলল, না বলল তাতে কিছু আসে যায় না। লোকে যাকে বড় বলে বড় সে নয়, নিজে যাকে বড় বলে বড় সেই হয়।

আর মানুষ ভালো বললে, সুনাম করলেই যে একজন ভালো ও গুণধর হবে—এমন কোনো কারণও নেই। এ ব্যাপারে আমার এক বন্ধু একটা গল্প শুনিয়েছিল। এক নারীর দুইটি সন্তান ছিল। একটি হলো নিজের ছেলে, অপরটি সতীনের ছেলে। সে সতীনের ছেলেটিকে সবসময় কোলে রাখতো, উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে ছেলেটিকে কখনো কোল থেকে নামাতো না! এমনকি কোলে-কাঁখে নিয়েই সংসারের কাজ করতো!

 কোথাও বেড়াতে গেলে সতীনের ছেলেটিকে কোলে এবং নিজের ছেলেটিকে হাত ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যেত, পাড়ার সবার ওই নারীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলো, সবাই বলতে লাগলো, ‘মেয়েটির মনে একটুও হিংসা নেই, সতীনের ছেলেকে কোলে আর নিজের ছেলেকে হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়ায়, সতীনের ছেলেকে এত আদর করতে আর কোথাও দেখা যায় না!

একদিন পাড়ার একজন দুষ্টবুদ্ধির নারী এসে সহানুভূতি দেখিয়ে বললো, ‘বুবু! নিজের ছেলেকে অবহেলা করে সতীনের ছেলেকে এত আদর করো কেন? নিজের ছেলের জন্য তোমার কি একটু মায়া-দয়া নেই?

সতীনের সংসার করা নারীটি বললো, নিজের ছেলেকে হাঁটিয়ে নিয়ে বেড়াই যেন তার পা শক্ত হয় এবং স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে মজবুত হয়ে দাঁড়াতে পারে! আর সতীনের ছেলেকে কোলে নিয়ে বেড়াই যেন সে দেরিতে হাঁটতে শেখে! কিন্তু মানুষ বুঝতে না পেরে আমার প্রশংসা করবে এটাই আমার চাওয়া ছিল এবং তাই হয়েছে!

কাজেই আসুন, আমরাও ওই নারীর মতো লোকের কাছ থেকে মিথ্যে প্রশংসা না কুড়িয়ে আগে নিজের কাছে নিজেকে বড় করে তুলি, মনের মধ্যে বিশুদ্ধতার গতি নিয়ে অনেক জোর দিয়ে যেন বলতে পারি: “আমি বড়, আমি ভালো”! পাড়ার লোকের প্রশংসা বা অন্যের র্যাঙ্কিংয়ের ধার ধেরে কী লাভ?

তার চেয়ে আমাদের উচিত নিজের ঢাক নিজে পেটানো। আমরা শ্রেষ্ঠ, আমরা সেরা, আমরা অনন্য-এমন একটা আত্মগর্ব প্রচারণা আমাদেরই চালাতে হবে। এজন্য কারো মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকার কোনো মানে নেই।

আজকের হাইটেক যুগে প্রত্যেকে নিজেকে নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অন্য কারোর দিকে তাকানোর সময় নেই। তাই সবাই নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে থাকে। পাশেরজনের মতামতের অপেক্ষা না করে নিজের কথা প্রচার করছে প্রতিটি মানুষ। এ যুগে নিজে নিজেকে না চেনালে অন্য কেউ কষ্ট করে চিনতে চায় না। আপনি যদি জেমস বন্ডের আগ্নেয়াস্ত্র আর ফেলুদার মগজ আর বিল গেটসের টাকা নিয়ে জন্মান, আর এই গর্বে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন আর ভাবেন কেউ এসে আমার ঢাকটা বাজিয়ে দেবে, তাহলেই শেষ। অতি অবশ্যই কিছুদিনের মধ্যে আপনার কেশরাশি বিরান হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তাছাড়া নিজের ঢাক নিজে না বাজালে সমূহ সর্বনাশের আশঙ্কা থাকে। নিজের ঢাক নিজে পেটানোর মধ্যে অনেক সুখ ও তৃপ্তি আছে। তাই নিজের গুণমুগ্ধ ভক্ত হন আর নিজের ঢাক নিজেই বাজিয়ে চলুন!

চেনা বামুনের পৈতা লাগে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের করা র্যাঙ্কিং দরকার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরং নিজেরাই নিজেদের একটা র্যাঙ্কিং করে ব্যাপক প্রচার চালাতে পারেন। দালালি, দলাদলি, রাজনীতি, হল-ক্লাসরুম-লাইব্রেরির করুণ মান, শিক্ষকদের প্রাচীন পদ্ধতির পাঠদান, কনসালটেন্সি, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর তুলনায় স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় যে এখনো টিকে আছে—এটাই তো বিস্ময়ের! এসব দিক বিবেচনা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই বিশ্বের মধ্যে নাম্বার ওয়ান! যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডিন ‘পাউন্ড না দেয়ার কারণেই বিশ্ব র্যাঙ্কিং থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দেয়া হয়েছে’- এমন একটা ডাঁহা মিথ্যে প্রকাশ্যে বলতে পারেন, তেমন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে থাকার কোনো দরকার আদৌ আছে কী?

n লেখক :রম্য রচয়িতা