কাগজে-কলমে প্রস্তুত ইসি অনুপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্তরা

আপডেট : ২৪ জুন ২০১৪, ২২:০৬
নির্বাচন কমিশন (ইসি) নারায়ণগঞ্জ উপ-নির্বাচনকে খুবই স্পর্শকাতর মনে করলেও কাগজে-কলমেই প্রস্তুতি সীমাবদ্ধ আছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কমিশনের কাছে নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা করা হলেও নীরব রয়েছে ইসি। সংশ্লিষ্টদের চিঠি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছেন তারা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগে কমিশনের প্রস্তুতি নিয়ে স্বয়ং কমিশনের কর্মকর্তারাও সন্তুষ্ট নন। যদিও গত ১৫ জুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ এই নির্বাচনকে স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। গত ২০ জুন থেকে বিদেশ সফরে থাকা সিইসির অনুপস্থিতিতে কমিশনের কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ৫ সদস্যের এই কমিশনে কোন সিদ্ধান্ত নিতে তিনজনের মত নেয়া বাধ্যতামূলক। তবে গত রবিবার থেকে একজন মাত্র কমিশনার অফিস করছেন। ইসি কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবও অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মোহাম্মদ আবু হাফিজ ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, নির্বাচন নিয়ে অন্যান্য কমিশনারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। আশা করছি, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। ইসির সংশ্লিষ্টরা জানান, কমনওয়েলথ কনফারেন্সের অংশ নেয়ার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ রয়েছেন কেনিয়ায়। ২০ জুন থেকে তিনি ২৬ জুন পর্যন্ত দেশের বাইরে থাকবেন। তার অনুপস্থিতিতে পরবর্তী সিনিয়র কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিদর্শনে চট্টগ্রামে গেছেন। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী রাজশাহী সফরে গেছেন। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ ছুটিতে রয়েছেন। ইসি সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিত্সাধীন। বাকী আরেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ সিইসির দায়িত্ব পালন করছেন। কমিশনের শীর্ষ ব্যক্তিদের এমন অনুপস্থিতিতে কমিশন পরিচালনায় কোন সমস্যা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে শারীরিকভাবে কারো উপস্থিতি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জ উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কমিশনে দেয়া চিঠি সম্পর্কে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ড. কামাল সিইসির কাছে চিঠি লিখেছেন। তাকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। এই উপ-নির্বাচনে পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এখানে উদ্বেগের কিছু নেই। তবে সম্প্রতি ওই শহরে সাত খুনের ঘটনার কারণে মানুষের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। এই নির্বাচনে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিইসি আবু হাফিজ বলেন, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোন ঘটনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে নির্দেশ রয়েছে। এমনকি পাশের আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর নিকট আচরণবিধি মেনে চলতে বার্তা পাঠানো হয়েছে। ইসির প্রস্তুতি ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, উপ-নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব), এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসার পর্যাপ্ত সংখ্যক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় ১৫টি মোবাইল টিম ও র্যাবের পৃথক ১৬টি মোবাইল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া ৩ প্লাটুন কোষ্টগার্ড ও ৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি অপরাধীদের তাত্ক্ষণিক সাজা দিতে ১০ জন নির্বাহী ও ২ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। ভোটগ্রহণের দিন সাধারণ কেন্দে ১৮ জন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ১৯ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। গতকাল দিবাগত রাত থেকে যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৩ ওয়ার্ড, ৪টি আংশিক ওয়ার্ড ও ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে আসনটি গঠিত। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪০৫ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩১১ এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ০৯৪ জন। সম্ভাব্য ভোট কেন্দে র সংখ্যা ধরা হয়েছে ১৪১টি এবং ভোটার কক্ষ ৬৭৪টি। এ উপ-নির্বাচনে ৪ প্রার্থী রয়েছেন। এরা হলেন- জাতীয় পার্টির এ কে এম সেলিম ওসমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আকরাম, মোহাম্মদ মামুন সিরাজুল মজিদ ও কৃষক, শ্রমিক, জনতা লীগের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম। দুই চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা সিআইডি’র (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) পরিদর্শক মহিউদ্দীন ও স্থানীয় কুতুপুর ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসি। ইসি কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফরহাদ হোসেন জানিয়েছেন, সিআইডি পরিদর্শক মহিউদ্দীনকে নির্বাচনী এলাকা ত্যাগের জন্য আইজির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। একইভাবে ভূমি সহকারী কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। সিইসিকে ড. কামালের চিঠি উপ-নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্ট নাগরিক ড. কামাল হোসেন চিঠি দিয়েছেন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদকে। চিঠি পাওয়ার পরে ইসি কার্যালয় তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই চিঠিতে ড. কামাল ছাড়াও এম. হাফিজউদ্দিন খান, এ, এস, এম শাহজাহান, মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুব্রত চৌধুরীর নাম রয়েছে। ইসি সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, চিঠির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, রিটানিং অফিসার, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হয়েছে।