কার্ডিফ সেন্ট্রাল স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেই প্রথম ধাক্কাটা হজম করতে হলো। স্টেশনের এক কর্মচারিকে হোটেলের ঠিকানা দেখিয়ে রাস্তা জানতে চাইলে তিনি হড়বড় করে বলা শুরু করলেন। কিন্তু তার কথার বিন্দুবিসর্গও বোঝা গেল না। এভাবে আরো কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো লাভ হলো না।
হোটেলে যাওয়ার পর ভুলটা ধরিয়ে দিলেন রিসেপশনে থাকা মেয়েটি। তিনি জানালেন-যুক্তরাজ্যের অংশ হলেও ওয়েলস পুরোপুরি আলাদা একটি দেশ। এখানে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ‘ওয়েলশ’ ভাষাতেও প্রচুর মানুষ কথা বলেন। দেশের নামের সাথে মিল রেখে এদের ভাষার নাম ওয়েলশ। এই দেশের মোট জনসংখ্যা ৩০ লাখ যার মধ্যে প্রায় ৬ লাখের ভাষাই ওয়েলশ। ওয়েলশের নিজস্ব আইন পরিষদ এবং জাতীয় পতাকা রয়েছে। সুতরাং ইংরেজি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্য থাকলেও লাভ নেই যদি আপনি কোনো খাঁটি ওয়েলশভাষীর পাল্লায় পড়েন।
আর এই যুক্তরাজ্যের ‘বাইরের’ দেশটিতেই গতকাল পর্যন্ত ছিলো বাংলাদেশের আস্তানা। এখানকারই সোফিয়া গার্ডেনসে প্রস্তুতি সারলো বাংলাদেশ দল।
ওয়েলশের রাজধানী কার্ডিফের বুক চিড়ে বয়ে গেছে টাফ নদী। এই নদীর তীর ঘেঁষে নগরীর প্রাণকেন্দ্রে দেশের প্রথম পাবলিক পার্ক সোফিয়া গার্ডেনসের অবস্থান। ১৮৫০ সালে নির্মিত এই পার্কটিতে ক্রিকেট খেলা শুরু হয় ১৮৬০ থেকেই। ১৯৬৭ সালে সোফিয়া গার্ডেনসের কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া হয় গ্ল্যামারগণ কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের হাতে। ২০০৭ সালে এই মাঠের উন্নয়ন কাজ শুরু হয় যা শেষ হতে প্রায় এক বছর লাগে। বর্তমানে কার্ডিফ ওয়েলস স্টেডিয়াম নামের এই মাঠটির দর্শক ধারণ ক্ষমতা ১৬ হাজার। ২০০৯ সালে একে শততম টেস্ট গ্রাউন্ডের মর্যাদা দেয় আইসিসি। ২০০৯ ও ২০১৫ সালে এই মাঠে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে অ্যাসেজ সিরিজ অনুষ্ঠিত হয়।
ওয়েলসে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশির বসবাস যার মধ্যে রাজধানী কার্ডিফেই থাকেন ২৫ হাজার। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকাংশ এসেছেন সিলেট থেকে। গতকাল বাংলাদেশ ভারত ম্যাচ শুরুর আগে খেলা দেখতে আসা কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। ল্যান্ডার্ফ নর্থ এর লেবার দলীয় কাউন্সিলর এবং সিটিজেনস এনগেজমেন্ট এর অ্যাসিস্টেন্ট ক্যাবিনেট মেম্বার দিলওয়ার আলী ছেলেকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রবাসে থাকলেও আমাদের মন সবসময় পড়ে থাকে বাংলাদেশে। প্রবাসী বাঙালিরা খুবই কর্মঠ। পরিবারের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এদেশে পড়ে থাকলেও দেশের উন্নয়নে তারা ভূমিকা রাখতে চান। দেশের জন্য কিছু করতে চান।’
সেলিম নামে এক যুবক জানালেন, কার্ডিফে অনেক বাঙালি থাকেন। তারা সবসময় অপেক্ষা করেন কখন টাইগাররা এখানে ক্রিকেট খেলতে আসবে, ‘কার্ডিফ গ্রাউন্ড বাংলাদেশের জন্য খুবই লাকি। এই মাঠে আমরা অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছিলাম।’
কার্ডিফকে বাগানের শহর বলাই ভালো। ছোটবড় অসংখ্য বাগান ও পার্ক আছে এখানে। কার্ডিফের বাসিন্দারা এমনিতেই খানিকটা বাগান প্রেমী। সবার বাড়ির সামনেই এক চিলতে বাগান। রাস্তার দুই ধারে প্রচুর গাছগাছালি রয়েছে। নানা প্রজাতির পাখির সাথে কাঠবেড়ালির লুকোচুরি দেখতে দেখতে আপনি অপার্থিব আনন্দ লাভ করবেন। ওয়েলসের সাধারণ মানুষ খুবই বন্ধুপরায়ন আর ফুর্তিবাজ। চলতি পথে যে কোনো সময় তাদের বন্ধুত্বের অত্যাচার আপনাকে সহ্য করতে হতে পারে। হঠাত্ করেই আপনাকে কেউ জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারে—‘সুটোটসি হেডুই?’ এমন উদ্ভট কথা শুনে ঘাবড়াবেন না। কারণ তিনি আপনার কাছে জানতে চেয়েছেন, আপনি কেমন আছেন? মৃদু হেসে তাকে উত্তর দিন, ‘রুইন ইয়ন’ অর্থাত্ আমি ভাল আছি। এরপর বিদায় নিন ‘ওয়েলচ সিতো’ বলে। এর অর্থ—ফের দেখা হবে।
