পঞ্চাশের দুজন কবি, এই বাংলায় শামসুর রাহমান ও ওপার বাংলার শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে, প্রথমে কবিতায় ও পরে ব্যক্তিগত পর্যায়েরও ঊর্ধ্বে এতটা ঘনিষ্ঠতায় আমি চিনি ব’লে; তাঁদের কবিতা নিজে পড়ে যতটা তার অন্তঃপুরে সহজ চেষ্টায় প্রবেশ করতে পারি—আলোচনার বেলায় ততটা সুবিচার ও অনন্যতা প্রকাশের ক্ষমতা অন্তত ভাষায় আমি পাই না।
আমি জানি, এঁদের দুজনের প্রতিভা একরকমের নয়—অবশ্য কোনো দুজন বড় প্রতিভারই চরিত্র কিংবা গড়ন এক হতে পারে না—একজন যদি গিয়ে থাকেন প্রেম, প্রকৃতি স্মৃতি থেকে ক্রমশ বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের দিকে; তবে অন্যজনের প্রতিভার মনঃপুত—প্রেম, মৃত্যুচিন্তা ও এই দু-রকম প্রবণতার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ, স্মৃতি।
শামসুর রাহমানের কবিতার পাঠক যেমন একই সঙ্গে কবিতাপ্রেমিক পাঠক ও পাঠিকা ও সাধারণ সামাজিক মানুষ, শক্তির পাঠক তেমন অর্থে জনসাধারণ নয়। কবিতার স্বার্থ ছাড়া আর কোনো চিন্তা, শক্তির কবিতাতে অধিকার পায়নি। হর্ষ, উল্লাস, বেদনা, উদ্বেগ, একাকিত্বের কষ্ট, মৃত্যুচিন্তা, প্রেম, নারী যৌনতা—এসব চেতনা বা অবচেতনার চার দেয়ালের বাইরে তাঁর কবিতা সংকল্পকে কখনোই বাইরে যেতে দেননি শক্তি।
তথাপি একটা মিলও এখানে অনুল্লেখ্য থাকাটা অন্যায় হবে—শামসুর রাহমান (জ. ১৯২৯) ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় (জ. ১৯৩৩) দুজনই তিরিশকে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করলেও বাংলা কবিতার এখনও পর্যন্ত প্রকৃত রূপকার ও আদর্শ যে রবীন্দ্রনাথ, এ বিষয়ে কারও সাবেকি বিন্দুমাত্র দ্বিধা ও হাল আমলের সংশয় ছিল না।
তাঁরা শামসুর রাহমান ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়; তাঁদের প্রথম পদক্ষেপেই এক অজ্ঞাত প্রাণোচ্ছলতা ও প্রতিভার প্রেরণা থেকে জেনেছিলেন যে, চল্লিশের কবিরা গৌণ হয়েছিলেন তিরিশের কবিতাকে উপেক্ষা করে এবং তদুপরি রবীন্দ্রভীতিকে অনাবশ্যক প্রশ্রয় দিয়ে। যুদ্ধোত্তর হতাশা, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, মানুষের উঁচু নিচু সমস্যা ও স্থূল সমাজমনস্কতা থেকে কবিতা ততদিনে সরে গেছে অনেক দূরে। এদেশে ও পশ্চিমে।
২.
‘দেশ আর বিদেশের পুরুষেরা/যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে’ (গোধূলি সন্ধির নৃত্য/জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ) কবি জীবনানন্দ দাশের এই অভয়বাণীর হাত ধরে শামসুর রাহমান ও শক্তি চট্টোপাধ্যায় পঞ্চাশের কবিতায় প্রবেশ করলেন নির্ভয়ে। অন্তত পরিপক্ক বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে। অর্থাত্ তাঁদের ধীশক্তির সামনে, রাজনীতি, সামাজিক দ্রোহ ও যুদ্ধপরবর্তী নৈরাশ্যের শুষ্ক মরুভূমি ছিল না। দিনেশ দাস যে বললেন, ‘এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে’; তা তাঁদের মুগ্ধ কিংবা লঘুভাবেও প্রভাবিত করল না। পঞ্চাশের এই কবিদের কাছে বরঞ্চ জরুরি জীবনানন্দ দাশের এই প্রশ্ন :
নক্ষত্রেরা মানুষের আগে এসে কথা কয় ভাবি;
পল অনুপল দিয়ে অন্তহীন নিপলের চকমকি ঠুকে
ঐ সব তারার পরিভাষার উজ্জ্বলতা;
আমার লক্ষ্য ছিল মানুষের সাধারণ হূদয়ের কথা
সহজ সঙ্গের মতো জেগে নক্ষত্রকে
কী ক’রে মানুষ ও মানুষীর মতো ক’রে রাখে।
তবু তার উপচার নিয়ে সেই নারী
কোথায় গিয়েছে আজ চ’লে;
এই তো এখানে ছিলো সে অনেক দিন;
আকাশের সব নক্ষত্রের মৃত্যু হলে
তারপর একটি নারীর মৃতু হয় :
অনুভব ক’রে আমি অনুভব করেছি সময়।
(সারাত্সার/বেলা অবেলা কালবেলা)
শক্তি তাকে নামিয়ে আনলেন আরও মর্ত্ত্য-চিন্তা ও শরীরী গন্ধের ভেতরে। এইভাবে—
আঁচলের খুঁটি ধ’রে গ্রাস করবো ও ভয়াল দেহ
সমস্ত কাপড় সুদ্ধ পিঠময় ছড়ানো সংগ্রাম
চুলের।
কী করবে তুমি? অলস প্রস্থিত রৌদ্রসম
ক্ষেতের সীমায় প’ড়ে বালুকায় রেখে শান্ত মাথা?
যে হূদয়—খেতে চাই তারে কি পায় না এইরূপে
কেউ, কোনোদিন, গিলে শক্তিমান রাক্ষসের মতো
অথবা ভূতের মতো স্পর্শে-স্পর্শে বাষ্পীভূত ক’রে
কিছুতেই—
সে কি থাকে ভগবান তোমার ভিতর?
(আঁচলের খুঁট ধরে গ্রাস করবো/হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য)
৩.
‘জীবনানন্দের পরে আরও একজন অপ্রস্তুত আগন্তুক এই কলকাতা শহরে’।
একটি বাদামি ঘোড়া সঙ্গীহীন অপরাহ্নে এসে
পড়েছে চওড়া পথে শহরের। মাংসের ভিতর
তার জীবনের মর্মমূল যেন করে থরথর
অবিরত; ট্রাফিক দ্বীপের ঘাস গাঢ় স্বপ্নাবেশে
খাচ্ছে সে নিঝুম আস্তে-সুস্থে, প্রায় তার ল্যাজ ঘেঁষে
একটি মোটরকার ছুটে যায় অকস্মাত্ খর
গতিতে এবং দূরে একজন বামন লজঝড়
গাড়ি ঠেলে, কোত্থেকে আওয়াজ আসে ভেসে সর্বনেশে।
এসব কিছুই তাকে, ঘোড়াটাকে, করে না বিব্রত।
পথের আক্রোশ, চোরা আঘাত অথবা পুলিশের
বাঁশি, যানবাহনের প্রতি সীমাহীন উদাসীন
সারাক্ষণ, মাঝে মাঝে চোখ তুলে এখানে কিসের
ডামাডোল, দেখে নিতে চায় কিছু। বুঝি সে প্রাচীন
শাপভ্রষ্ট গ্রীক দেব, আগন্তুক বিভ্রান্তিবশত।
(একটি বাদামি ঘোড়া/ শা রা শ্রে ক পৃ:২৯০)
শামসুর রাহমানের সম্পূর্ণ কবিতাটি উদ্ধৃত করার প্রয়োজন হলো এ-জন্যে যে, শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে আগন্তুকের এই চকিত বিহ্বলতা কিংবা ভীতি প্রযোজ্য না হলেও শক্তি ও জীবনানন্দের সচেতন মনের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি শহর, বিশেষত কলকাতা শহর; তাদের স্বভাব-স্থিরতা ও স্থিতধী জীবনলিপ্সার অনুকূল ছিল না।
আমরা জানি, জীবনের যতখানি অবসর ও ছুটি কিংবা খেয়ালখুশির হাওয়ায় ভাসতে পেরেছিলেন বা পেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়,—মুহূর্ত চিন্তা না করে ছুটে গিয়েছেন; পাহাড়ে, অরণ্যে কিংবা সমুদ্রের বিশাল স্বচ্ছতায়! প্রথম জীবনের বাউণ্ডুলে জেদের মুক্তি ছিল চাঁইবাসা—প্রলুব্ধ হ’য়ে সময়ে-অসময়ে ছুটে যেতেন শক্তি এবং অন্যরা।
কিন্তু দেশ-বিভাগের শিকার জীবনানন্দের সে সুযোগও ছিল না; তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ তখন কেবল স্মৃতির সম্বল আর বর্তমান কলকাতা—
আজকে যখন সান্ত্বনা কম, নিরাশা ঢের, চেতনা কালজয়ী
হতে গিয়ে প্রতি পলেই আঘাত পেয়ে অমেয় কথা ভাবে,—
আজকে যদি দীন প্রকৃতি দাঁড়ায় যতি যবনিকার মতো
শান্তি দিতে, মৃত্যু দিতে—জানি তবু মানবতা নিজের স্বভাবে
কালকে ভোরের রক্ত প্রয়াস সূর্য সমাজ রাষ্ট্রে উঠে গেছে;
ইতিহাসের ব্যাপক অবসাদের সময় এখন, তবু, নরনারীর ভিড়
নব নবীন প্রাক্সাধনার—নিজের মনের সচল পৃথিবীকে
ক্রেমলিনে লন্ডনে দেখে তবুও তারা আরো নতুন অমল পৃথিবীর।
(প্রয়াণ পটভূমি/বে. অ. কা)
অথবা
যতটা দূর যেতেছি আমি সূর্যকরোজ্জ্বলতাময় প্রাণে
ততই তোমার স্বত্বাধিকার ক্ষয়
পাচ্ছে বলে মনে কর? তুমি আমার প্রাণের মাঝে দ্বীপ,
কিন্তু সে দ্বীপ মেঘনা নদী নয়।’—
(যদিও দিন/বে. অ. কা)
তাই এই শহরকে জীবনানন্দের আফ্রিকার মতো মনে হয়; যেখানে হটেনটট-জুলু দম্পতিরা উঠে আসে, লোল নিগ্রো হেসে হাতের ব্রায়ার পাইপ পরিষ্কার করে পরম বিশ্বাসে এবং সেই সাথে কখনো কখনো কলকাতার বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের বাতাসে লিবিয়ার জঙ্গলের গন্ধ উঠে আসে। নগরীর মহত্ রাত্রি বস্তুতই প্রহসন, আর তার নৈশ কিংবা দিবসের মানুষেরা প্রকারান্তরে জন্তু—কবির চোখে এই সত্য ধরা পড়ে যে, এরা এখানে, ‘বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত’।
ট্রাম, বাস, যানজট, ভিড়, কোলাহল, দালাল, চাকুরের ঊর্ধ্বশ্বাস কলকাতার প্রকৃতিও নিষ্ঠুর; অন্তত তার প্রতি প্রকৃতির আচরণ নিষ্ঠুরতারই :
সেই কলকাতা আজ পুড়ে যাচ্ছে বলে দুঃখ হয়
রোদ্দুরের মধ্যে বসে তোমরা কী করে শান্ত আছো?
ধুলোর বাতাস তুচ্ছ, তুচ্ছ শহরের পরিশ্রম
এই স্থির পাথরের পবিত্রতা কোথায় পেয়েছো?
কতদিন বসে আছো একভাবে—বয়স বাড়ে না?
ভালো হয়? যদি আমি গিয়ে বসি তোমাদের পাশে—
কিছুক্ষণ।
(কিছুক্ষণের জন্যে/অ. গৌ. এ)
আবার শালবন, রাত্রির দাঁদ, দূরের অস্পষ্ট পাহাড়, মহুয়ার মদ, মেঠো রাস্তা—এ-সব ছেড়ে আসা জীবন চায় এই কলকাতা; দুঃসহ, দুর্বহনীয় কলকাতাকে পুড়িয়ে দিতে। সেই ক্রোধও অত্যন্ত স্পষ্ট ও সোচ্চার :
যেন আমি কিছু কিছু মানুষের জন্যে নয়, সকলের জন্যে বেঁচে আছি
যদি বেঁচে থাকা বলে, যদি একে চলচ্চিত্র বলে!
... ... ...
মাঝে মাঝে মনে হয়, কলকাতার পয়ঃপ্রণালীর
মধ্যে থেকে উঠে আসে, আজীবন যে শুয়ে রয়েছে... শিশু
যারা সামাজিক মাতা-পিতা নয় স্তম্ভিত ক্রীড়ায়
যে বোঝে সবার মধ্যে লক্ষ্যণীয় স্থান নেই তার—
নিতে হবে, ছলে বলে, কেড়ে ও কৌশলে
রক্তে ও চোখের জলে ভেসে যাবে গাঙ্গেয় কলকাতা...
শিরার সড়ক খুলে ঢালা হবে প্রসিদ্ধ বিদ্যুত্
জ্বলবে ও জ্বালাবে তাকে এবং কলকাতা জ্বলে যাবে।।
(আমি সহ্য করি/ঈ. খা. জ)
এই যে আগন্তুকের অস্বস্তি, পরে দ্রোহ ও নগরের প্রতি অবিশ্বাস—এ থেকে শক্তি আমৃত্যু মুক্তি পাননি। তাঁর মনের শক্তি আধুনিকতার, দ্বন্দ্ব ও আর্তি আধুনিক মানুষের—কিন্তু বিরূপ বিশ্ব ও বিরূপ নগরের কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে অনেক সহনীয় ও প্রার্থিত প্রকৃতির কাছে নিঃশর্ত বিসর্জন। এ-কথাটি অনেকভাবে বলেছেন শক্তি, শিল্পচর্চা থেকে জীবনযাপনে। ক্ষতিকর জেনেও আত্মধ্বংসে ছিলো তাঁর অপার উত্সাহ। ১৩৬৭ তে প্রকাশিত ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ তাঁর প্রথম গ্রন্থের প্রথম কবিতার (জরাসন্ধ) ধাতব চীত্কারই এরকমের :
আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।
... ... ...
তবে হয়তো মৃত্যু প্রসব করেছিল জীবনের ভুলে। অন্ধকার
আছি, অন্ধকার থাকবো, বা অন্ধকার হবো
আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।
৪.
মৃত্যুচিন্তা, বেঁচে থাকার প্রবল বাসনা, আবার প্রতিরোধের শক্তির অভাবে আত্ম-বিনাশের ক্রম-সাধনা।
মাইকেলের কাব্যে মৃত্যু-চেতনা নেই, আছে ধ্রুপদী সমগ্রতা—যদিও ব্যক্তিজীবনে মাইকেল অস্থির, আত্মবিনাশী রোমান্টিকদের মতো দূরের বিশুদ্ধতায় বিলাসী (সনেট ও চতুর্দশপদীর কথা যদি মনে রাখি)—আগাগোড়া সংস্কার-ভাঙা, মূল্যবোধ ও সুরুচিকে ঠাট্টা করার প্রবণতা যাঁর; সেই শক্তিকে মাইকেলের পাশে বসাতে পারি না। পারি না, নজরুলকেও; যদিও কিনা বোহেমিয়ান চলন-বলন ও একধরনের হাত-পা ছাড়া বাউণ্ডুলেপনায়, নজরুলেরই কাছাকাছি তিরিশ পরবর্তী কবিতার একমাত্র দৃষ্টান্ত শক্তি—এবং শক্তি ছাড়া, আর কেউ নন, বাকিরা কেবলই চেষ্টাকৃত সমাজবিরোধী। কিন্তু নজরুলের ছিল বৃহত্তর জগত্; শ্রেয়বোধ, ধার্মিকতা, স্বদেশ ও স্বদেশপ্রেম, স্বজাতির মুক্তি চিন্তা—এবং এসব তাঁর কাছে, তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মূর্ত ও অর্জিত নয় ব’লে বিদ্রোহে উচ্চকণ্ঠ। তাতে, কবিতা কিংবা শিল্পের কতটুকু ক্ষতি কিংবা অঙ্গহানি হ’লো; সেই সুবুদ্ধিকেও প্রশ্রয় ও পাত্তা দেননি নজরুল। নজরুলের কবিতা বহু মানুষের জন্য; একটি শুভ রাষ্ট্রের জন্যে, অনুষ্ঠান ও উপলক্ষের জন্যে রচিত—এ জন্যেই তিনি জাতীয় কবি—ইতিহাসে এ-রকম ঐশ্বর্যমণ্ডিত প্রবল সৃষ্টিশীল ও প্রত্যক্ষ কবিকে রাষ্ট্র সর্বদাই উঁচু আসন দেয়।
কিন্তু এরই পাশে থাকেন আরেক ধরনের কবি; অপরিচিত, আত্মমগ্ন, নিভৃত, প্রগাঢ় ও তীক্ষ্ন। এই বিশেষণের সব ক’টি শক্তির সম্পর্কে আমরা হয়তো ব্যবহার করব না; কিন্তু কয়েকটি অন্তত করব বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই; কেননা একালের কবির পক্ষে বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘বহুমুখী, বহুপ্রসূ, বিস্তীর্ণ, রাজকীয়, বিজয়ী, যুগস্রষ্টা বা যুগপ্রতিভূ’ হওয়া সম্ভব নয়। একালের কবি দ্বন্দ্ব-রক্তিম ও আত্মসমালোচক। আত্মজৈবনিক কবি লেখেন নিজের গরজে; নিজেকে বিশ্লেষণ করেন প্রীতিহীন অভিজ্ঞতার আলোকে এ-জন্যে কি শক্তি নিজের কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখেন ‘যে কোন লেখকের পদ্যই দীর্ঘ কাব্য—তিনি লেখেন টুকরো-টুকরো করে এইমাত্র।’
আবার কবিতা যে কোনো সামাজিক উপযোগিতার বিষয় নয়, শক্তি তাও বলেন অত্যন্ত অকপটে; ‘কবিতা কবিগণের কাছে একপ্রকারের নিভৃত ও নির্জন যৌনাচার। কবিতা ঘোরতর অসামাজিক।’ ফলে, শক্তি তাঁর কবিতায় খণ্ড কবিতার অদৃষ্ট নিয়েই এগিয়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। উত্তরজীবনে তাঁর কয়েকটি দীর্ঘ কবিতার চেষ্টা দেখি বটে, তবে তা সমগ্রতার আভা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি, অনেকগুলি খণ্ড কবিতা কিংবা খণ্ড কবিতার আলাদা স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য নিয়েই তা উজ্জ্বল।
এখন আমরা দেখব শক্তির অন্বেষণের বিষয়গুলি কী? মৃত্যুচিন্তা (তা ভীতির, অভিমানের কিংবা উত্কণ্ঠার; যাই-ই হোক না কেন), প্রকৃতির প্রতি আসক্তি বা মমতা ঈশ্বরভাবনা১ ও বেঁচে থাকার প্রচণ্ড তাড়নায় নিজেকে নিয়ে শ্লেষ বা ঠাট্টা।
এ সব কিছুই আমরা তিরিশের প্রধান পাঁচ কবির কবিতাতেও পাই। তবে জীবনানন্দে একটু ভিন্ন ধরনের২। কিন্তু শক্তির কবিতা ব্যক্তির আর্তি, দুঃখ, উন্মদনা, ক্লেশ ও নাগরিক চাপের কাছে বন্দী-জীবনানন্দ দাশের মতো কোনো ইতিহাসচেতনা ও কল্যাণের কাছে সমর্পিত হয়নি। জীবনানন্দই বলতে পারেন হতাশার হাওয়াকে সরিয়ে।
মানুষের প্রাণ থেকে পৃথিবীর মানুষের প্রতি
যেই আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফিরে আসে, মহাত্মা গান্ধীকে
আস্থা করা যায় বলে;
হয়তো বা মানবের সমাজের শেষ পরিণতি গ্লানি নয়;
হয়তো বা মৃত্যু নেই প্রেম আছে। শান্তি আছে, মানুষের অগ্রসর
আছে...
(মহাত্মা গান্ধী/ বে অ কা)
অথবা :
আমি তবু বলি :
এখন যে ক’টা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি,
দেখা যাক পৃথিবীর ঘাস
... ... ...
ইতিহাস খুঁড়লেই রাশি-রাশি দুঃখের খনি
ভেদ করে শোনা যায় শুশ্রূষার মতো শত-শত
শত জলঝর্ণার ধ্বনি।
(হে হূদয়/ বে অ কা)
কিন্তু শক্তি পারেন না হতাশার ঢাকনা খুলে নীলিমার বিশুদ্ধতার দিকে তাকাতে :
মাঝে মাঝে মনে হয়, কলকাতার পয়ঃপ্রণালীর
মধ্যে থেকে উঠে আসে, আজীবন যে শুয়ে রয়েছে শিশু...
যারা সামাজিক মাতা-পিতা নয় স্তম্ভিত ক্রীড়ায়
যে বোঝে সবার মধ্যে লক্ষ্যণীয় স্থান নেই তার—
নিতে হবে ছলে বলে কেড়ে ও কৌশলে
রক্তে ও চোখের জলে ভেসে যাবে গাঙ্গেয় কলকাতা...
শিরার সড়ক খুলে ঢালা হবে প্রসিদ্ধ বিদ্যুত্
জ্বলবে ও জ্বালাবে তাকে এবং কলকাতা জ্বলে যাবে।
(আমি সহ্য করি/ ঈশ্বর থাকেন জলে/শ্রেষ্ঠ কবিতা/ শ চ)
ঐশ্বর্যের প্রয়োজন নেই, তার দাবি অল্প। কিন্তু সেখানেও প্রহসন :
সিন্দুকের ডালা খোলা, তার মধ্যে রাজরাজেশ্বর
মোহর,
আমার ক্ষুধা একমুঠো ভাতের।
প্রয়োজন ছিল নদী, ঠেকেছি পাথরে,
সুখের কাপাস আনতে খোঁচাই কাতরে,
স্বাভাবিক
(প্রচ্ছন্ন স্বদেশ/প্র স্ব)
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি ক্ষণবাদী দর্শনের প্রচ্ছন্ন উত্সাহে ঈশ্বরকেই খারিজ করে দিয়েছিলেন এককথায়, ‘হয়তো ঈশ্বর নেই স্বৈর সৃষ্টি আজন্ম অনাথ’—সেক্ষেত্রে শক্তির তো ঈশ্বর আছে, তাঁরই ভাষায় অনেক বড় ঈশ্বর। কিন্তু তার পরেও তাঁর নৈরাশ্য ও হতাশার কারণ কী? কারণ সম্ভবত শক্তির মতে মানুষ জন্ম থেকেই খঞ্জ আর সেজন্যেই দৈব ও অদৃষ্টের হাতে ক্রীড়নক :
কিন্তু, সে তো জন্ম থেকেই মাটির ওপর পড়ছে
বস্তু থেকে নিচ্ছে বিকাশ, আর কিছুটা গড়ছে
মনের মতন বনের মতন—যেমন লোহায় মরচে
এবং সে তো জন্ম থেকেই মাটির ওপর পড়ছে
(জন্মে থেকেই মাটির ওপর/ঈ থা জ)
ভালো করার সত্ সংকল্প, কঠিন প্রচেষ্টা সবই এখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য;
‘ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙ্গে/মানুষ ছিলো নরম/কেটে,
ছড়িয়ে দিলে পারতো।/অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে
জান্লায়!/পাথর কেটে পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ।’
জীবনানন্দ সেখানে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেন, ‘অর্থ নয়, কীর্তি নয়,
সচ্ছলতা নয়’ নিশ্চিতভাবেই; ‘আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের
অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে;/আমাদের ক্লান্ত করে,/
ক্লান্ত-ক্লান্ত করে’; শক্তির কাছে তা শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের চৌকাঠ পেরিয়ে স্থির বিশ্বাসেও পৌঁছায় না:
ভিতরে আছে কি কেউ? রক্তের ভিতরে কেউ আছে?
মনে হয় ঘুমঘোরে তাকে দেখে চেনাও সম্ভব
জেগে কখনোই নয়, সচেতনভাবে যেন নয়
তাকে পেতে গেলে দীর্ঘ ঘুম চাই, হিম মৃত্যুচাই
(ঝর্ণা শুধু যাবে বলে/ ঈ থা জ)
কেন পৌঁছায় না, এটা শক্তির প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে শেষ কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত এগোলে ভুরিভুরি উদ্ধৃতি দিয়ে আমরা দেখাতে পারি। নিবিড়ভাবে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার ইচ্ছা থেকে যে বেদনার উদ্ভব হয়; মরত্ব যার অন্যতম তো বটেই বলব প্রধান কারণ—তাকে বাঁচতে হয় অদ্ভুত ও দ্বৈত লিপ্সা নিয়ে; হতাশা আবার আশা, আনন্দ ও সে-সঙ্গে বিষাদ, প্রেমের রহস্যময়তার পাশাপাশি বিচ্ছেদের বিষণ্ন স্মৃতি। প্রথম যৌবনে যে খুব অহঙ্কার করে বলেছিলেন; ‘খুব বেশি দিন বাঁচবো না আমি বাঁচতে চাই না’; সে দম্ভের মুখোশ তো কাতর কণ্ঠেই খুলে দিলেন, ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কবিতায়।
শক্তির অস্থিরতা, শক্তির দ্বিধা, শক্তির অনিশ্চয়তা, শক্তির অসহায়ত্ব, শক্তির অস্পষ্টতা-ভীতি সবই ধরা পড়ে তাঁর কবিতায় অজস্র প্রশ্নবোধক ও আশ্চর্যচিহ্নের ব্যবহারে। পার্থিব মানুষের কাছে ঈশ্বরের জন্যে মানুষ ও মানুষের জন্যে ঈশ্বর—বরাবর এ কথাই আমরা শুনে এসেছি, কিন্তু শক্তির কাছে তাও যেন নিশ্চিত, উজ্জ্বল ও প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষ্য দেয় না :
অদ্ভুত ঈশ্বর এসে দাঁড়িয়েছেন মৃন্ময় উঠোনে
একদিকে শিউলির স্তুপ,
অন্যদিকে দ্বাররুদ্ধ প্রাণ
কার জন্যে এসেছেন—
কেউ কি তা স্পষ্ট ক’রে জানে?
(কার জন্যে এসেছেন?/ঈ. খা. জ)
এই জানতে না পারার অসহ্য চঞ্চলতা নিয়ে শক্তি পঁয়তাল্লিশটি কাব্যগ্রন্থের প্রায় আড়াই হাজার কবিতায় ছুটেছেন অক্লান্ত তৃষ্ণা নিয়ে—পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হবে না; তাঁর কবিতা শান্তি ও বিশ্রাম না-পাওয়া এক স্বর্গভ্রষ্ট কবির কবিতা।
আগামী সংখ্যায় সমাপ্য
ভূমিকা ও সংগ্রহ
ফারুক মাহমুদ
সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ছিলেন বিপুলপ্রজ। সঙ্গতকারণে তাঁর কবিতার সংখ্যাও বিপুল। কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখেছেন। এর সংখ্যাও কম নয়। গদ্য লেখা সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্য হচ্ছে, ‘কবিতার মতো নিয়মিত ও প্রথাগত পরিশ্রম কিংবা বহুদিনের শ্রম যুক্ত করে প্রবন্ধ আমি সচরাচর লিখিনি। অনেক লেখাই, বিশেষ কোনো কাগজের সম্পাদকের অনুরোধে; বন্ধুদের ইচ্ছায় বা কেন গদ্য লিখছি না? এমন কোনো কোনো শুভানুধ্যায়ী ও অনুরাগী পাঠকের চাপেও কয়েকটি প্রবন্ধ ও গদ্য লিখেছি।’ তবে বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি সামান্য ব্যতিক্রম, লিখেছেন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে, মনের তাগিদে।
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং সিকদার আমিনুল হকের মধ্যকার সম্পর্কটি প্রচলিত দুই কবির সাধারণ সম্পর্ক ছিল না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঢাকায় এলে সিকদার আমিনুল হকের এলিফেন্ট রোডের বাসায় অবস্থান করতেন। ফলে দু’ কবির মধ্যে গড়ে উঠেছিল পারিবারিক সম্পর্ক। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণে বাংলাদেশের কবি-পাঠক শোকাহত হয়েছেন। সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ—এঁদের আগ্রহে দ্বিমাসিক পত্রিকা ‘পূর্ণতা’ একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। পত্রিকাটির সম্পাদক লতা হোসেন। কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা পূর্ণতা’র অতিথি সম্পাদক ছিলেন রফিক আজাদ। এটির প্রকাশকাল জুলাই ’৯৬। উল্লিখিত সংখ্যায় সিকদার আমিনুল হক লিখেছিলেন ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধ। ব্যক্তিগত স্মৃতি তর্পণের পাশাপাশি শক্তি চট্টোপাধ্যয়ের কবিতার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
সিকদার আমিনুল হকের দুটি প্রবন্ধ গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর জীবদ্দশায় দ্বিতীয় প্রবন্ধের বই ‘মৃত্যুচিন্তা :এবার হলো না গান’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৫ সালে। আলোচ্য প্রবন্ধটি তাঁর কোনো গ্রন্থভুক্ত নয়। ২৫ নভেম্বর ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন আর ৬ ডিসেম্বর সিকদার আমিনুল হকের জন্ম। দুই কবির জন্মদিন মনে রেখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা সিকদার আমিনুল হকের অগ্রন্থিত প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হলো—
