এরশাদের সামনেই বাবলু-কাদের কথা কাটাকাটি

আপডেট : ২৫ জুন ২০১৪, ২২:১৫
দলে কে জ্যেষ্ঠ—সেই প্রশ্নে এবং একইসঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে থাকা নিয়ে প্রকাশ্য বিতণ্ডায় জড়ালেন জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের। গতকাল বুধবার দলীয় এক অনুষ্ঠানে জিএম কাদের পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন ও বর্তমান সরকারের কড়া সমালোচনা করলে ক্ষিপ্ত হয়ে অনুষ্ঠানস্থল থেকে চলে যান বাবলু। পরে জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের সামনেই দলের এই দুই নেতা পরস্পরের বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘আমাদের মধ্যে মতবিরোধ আছে’ মন্তব্য করে দ্রুত সভা শেষ করেন এরশাদ। গতকাল রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে জাতীয় মত্স্যজীবী পার্টির আলোচনা সভায় এ ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে দলের বর্তমান দ্বি-মুখী অবস্থান বোঝাতে গিয়ে জিএম কাদের বলেন, ‘আপনি উরুগুয়ের স্ট্রাইকার, আবার ইতালিরও গোলকিপার, এটা হয় না। আপনি একইসঙ্গে স্বামী আবার একইসঙ্গে স্ত্রী, এভাবে সংসার হয় না। মানুষ জাপাকে কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু আমরা কী সেই বিরোধী দল আছি? একসঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থাকা সংবিধানের সঙ্গে যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতির আবহে এটি পরিচিত না।’ সভামঞ্চে এরশাদের বামে বসা ছিলেন জিয়াউদ্দিন বাবলু, ডানে ছিলেন জিএম কাদের। জিএম কাদেরের আগে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাপার দলীয় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য খুরশীদা হক। তার বক্তব্যের পর বক্তব্য দেয়ার জন্য জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করা হয়। জিএম কাদের প্রথমে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি চেয়েছিলেন আগে মহাসচিব বাবলু বক্তব্য রাখবেন, তারপর ‘জ্যেষ্ঠতা’র বিচারে তিনি বক্তব্য দেবেন। তবে বাবলুও তখন বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় উপস্থিত কর্মীরা বলতে থাকেন ‘আমরা জিএম কাদেরের বক্তব্য শুনতে চাই’। কর্মীদের স্লোগান ও এরশাদের অনুরোধের পর জিএম কাদের বক্তব্য দিতে আসেন। মূলত এখান থেকেই বাবলু-জিএম কাদেরের মধ্যে পরস্পরবিরোধী ক্ষোভের শুরু। বক্তব্য দিতে গিয়ে জিএম কাদের পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন ও বর্তমান সরকারের বৈধতার প্রশ্ন তুলে ব্যাপক সমালোচনা করেন। তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে মঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ান জিয়াউদ্দিন বাবলু। চেয়ার থেকে ওঠার সময় পাশে থাকা এরশাদ তার হাত ধরলেও তিনি শোনেননি। উঠে দাঁড়ানোর পর তাকে হাত ধরে মঞ্চে বসানোর চেষ্টা করেন জাপা’র দুই কেন্দ্রীয় নেতা ফয়সল চিশতি ও নূরুল ইসলাম নূরু। তাদের কথাও না শুনে অনুষ্ঠানকক্ষের বাইরে চলে যান বাবলু। এসময় জিএম কাদের বলেন, ‘আমি তো কাউকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে বলছি না।’ বাবলু যখন চলে যাচ্ছিলেন তখন মঞ্চে বসা এরশাদকে বেশ বিব্রত ও বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। অনুষ্ঠানস্থলেও শুরু হয় ব্যাপক হইচই। এই অবস্থার মধ্যেই এরশাদ উঠে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘আজকে এখানে মত্স্যজীবীদের নিয়ে বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা রাজনৈতিক পর্যায়ে চলে গেছে। আমাদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। সেটা আমি মেনে নিয়েছি। এখন আমরা বিরোধী দল। এ অবস্থানে থেকে নিজেদের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমি আমার স্ত্রীকে (রওশন) বলেছি দলকে এগিয়ে নিতে সত্যিকার বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। ভারাক্রান্ত হূদয় নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না। শুধু একটা কথা বলতে চাই বিএনপি দিশেহারা। তাদের অবস্থানে গিয়ে আমাদেরকে ক্ষমতায় যেতে হবে।’ একথা বলেই ম্লান মুখে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হয়ে এরশাদ চলে যান আইডিইবি’র সভাপতির কক্ষে। এরপর সেখানে আসেন জিএম কাদের। ততক্ষণে দলের কয়েকজন নেতা-কর্মী আইডিইবি’র মূল গেট থেকে মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুকে ফিরিয়ে এই কক্ষে নিয়ে আসেন। সেখানে উপস্থিত থাকা জাপা’র একাধিক নেতা জানান, ওই কক্ষে ঢুকেই জিএম কাদেরকে উদ্দেশ্য করে বাবলু বলেন, ‘আমি যখন মন্ত্রী ছিলাম, তুমি তো আমার কর্মচারী ছিলে, তুমি তখন পেট্রোবাংলায় চাকরি করতে। এখন তুমি নাকি আমার সিনিয়র হয়ে গেছ, তুমি এত বড় বড় কথা বল কেন, তোমার কাছ থেকে কী রাজনীতি শিখতে হবে?’ পাল্টা জবাবে জিএম কাদেরও তাকে বলেন ‘হোয়াট ননসেন্স ইউ আর, হোয়াট আর ইউ টকিং, তোমার তো সাহস কম না।’ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এরশাদের ধমকে দু’জন শান্ত হন। ঘটনার বিষয়ে পরে জিয়াউদ্দিন বাবলু ইত্তেফাককে বলেন, ‘সেখানে যে ধরনের বক্তব্য, কথাবার্তা এসেছিল, সেগুলোর সঙ্গে আমার দ্বিমত ছিল। সে কারণে আমি মনে করেছি, চলে যাওয়াটাই সমীচীন।’ অপরদিকে জিএম কাদের বলেন ‘সত্য কথা অনেক সময় রুঢ় হয়। আমি সত্য বলার কারণে কেউ যদি রাগ করে চলে যায়, তাতে তো আমার কিছু করার নেই।’ এর আগে অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে জিএম কাদের বলেন, ‘কি প্রক্রিয়ায় এ সরকার ক্ষমতায় আছে, নির্বাচন হয়েছে, এটা সবারই জানা। সরকারের আইনি ভিত্তি দুর্বল। আওয়ামী লীগ জনগণের আস্থায় আছে বলে আমি মনে করি না। নিজেদের নৈতিক অবস্থান যে দুর্বল এটা সরকারও জানে। তাই তারা অস্বস্তিতে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাপাকে বিরোধী দল হিসেবে গেজেট প্রকাশের পর এরশাদ সাহেব সম্মত হয়েছেন এ অবস্থা মেনে নিতে। কাজেই এক খেলোয়াড় দুই দলের হয়ে খেলার সুযোগ নেই। তবে আমি কাউকে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করতে বলছি না। আমি জানি আমার এ কথাগুলো অনেকেরই ভালো লাগবে না। তাই কথা বলতে চাইনি।’ জিএম কাদেরের আগে খুরশীদা হক বক্তব্যে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পার্টি করলেও আমরা এতদিন কিছু পাইনি। কর্মীরাও হতাশ ছিল। এবার রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হওয়ায় আমি এমপি হতে পেরেছি।’ তার এই বক্তব্যের সময় এরশাদ অসন্তোষ প্রকাশ করলে তিনি বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করেন। খুরশীদার আগে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের বিষয়ে এরশাদের অবস্থান সঠিক ছিল। সবাই তার নির্দেশ মানলে ইতিহাস ভিন্ন হতো। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সোমনাথ দেব।