জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন যশোরের ফল ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান নান্নু। তার বাম পায়ের উরুতে দুটি গুলি লেগেছে। চিকিত্সকরা অপারেশন করে গুলি দুটি বের করতে পারেননি। হাড়ের ভিতরে ঢুকে থাকা গুলির কারণে তার পায়ে পচন শুরু হয়েছে। তাই চিকিত্সকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নান্নুকে সুস্থ করে তুলতে হলে পা কেটে ফেলতে হবে।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে নান্নু বলেন, গত ৩১ মে বিকালে যশোরের মনিহার বাসস্ট্যান্ডের সামনে ফলের দোকান থেকে নান্নুকে যশোর কোতয়ালি মডেল থানার এসআই শোয়েবের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেয়। দুই ঘন্টা ধরে মাইক্রোবাসে ঘুরানোর পর যশোর-বোনপোল সড়কের ভাতুরিয়া এলাকায় গিয়ে থামে মাইক্রোবাসটি। গাড়ির ভিতরে এসআই শোয়েব মোবাইল ফোনে একজনের সঙ্গে কথা বলেন। ‘বস ফুল করব না হাফ করব’। অপর প্রান্ত থেকে নির্দেশ আসার পর শোয়েব একজন কনস্টেবলের কাছ থেকে শটগান নিয়ে নান্নুর বাম পায়ের উরুতে ঠেকিয়ে পরপর দুই রাউন্ড গুলি করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় নান্নুকে সেখানে ফেলে দেয়া হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি পিস্তল ও একটি ককটেল উদ্ধার দেখায়। এরপর পুলিশের আরো একটি টিম সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে যশোর আড়াইশ বেডের হাসপাতালে ভর্তি করে। তার অবস্থার অবনতি হলে পরদিন চিকিত্সকরা তাকে ঢাকার জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠায়। গুলিবিদ্ধের ঘটনায় কোতয়ালি থানায় এসআই শোয়েব অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন নান্নুর বিরুদ্ধে। এই দুই মামলায় নান্নুকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পুলিশ প্রহরায় জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালে নান্নুকে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। হাসপাতালের বেডের পাশে নান্নুর স্ত্রী লতা তাকে দেখাশুনা করছেন। লতা অভিযোগ করেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোন মামলা এমনকি জিডিও নেই।
গতকাল নান্নুকে দেখতে গিয়েছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। হাসপাতালের এবি ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে থাকা নান্নুকে দেখে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। নান্নু মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে তার ওপর পুলিশের অমানবিক নির্যাতন ও হত্যা প্রচেষ্টার বর্ণনা দেন।
এসময় নান্নু (৩৮) সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, যশোরে অস্ত্র ব্যবসায়ী সাকিব, সোহাগ, আউয়াল মিস্ত্রি, নুরু ও নূর উদ্দিন কয়েক মাস আগে র্যাব ও পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। জামিনে তারা ছাড়া পেয়ে সন্দেহ করে যে, তাদের ধরিয়ে দেয়ার পিছনে তার হাত রয়েছে। এ কারণেই এসআই শোয়েবকে দিয়ে তাকে উঠিয়ে নিয়ে গুলি করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, গুলি করার আগে তার কাছ থেকে শোয়েব ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন।
এবি ওয়ার্ডের আরেকটি বেডে শুয়ে আছেন সালমান সিকদার বিকি। তার বাড়ি যশোরের বেজপাড়ার গুনপাড়ায়। হাসপাতালের বেডে শুয়ে বিকি বলেন, গত ১৫ জুন রাত ১১ টার দিকে বিকিকে এসআই শোয়েবের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেয়। চাঁচাঢ়া এলাকায় নিয়ে গাড়ির ভিতর তার বাম পায়ের হাঁটুতে শটগান ঠেকিয়ে দুই রাউন্ড গুলি করে পুলিশ। পরে পুলিশ তাকে যশোর আড়াইশ’ বেডের হাসপাতালে ভর্তি করে। একদিন পর তাকেও পাঠানো হয় জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, বিকি’র বাম পায়ের হাঁটু থেকে কেটে ফেলতে হবে। বিকিও অভিযোগ করেছেন, এসআই শোয়েব গুলি করার আগে তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন।
পুলিশের গুলিতে আহত এই দুইজনের চিকিত্সার খোঁজ খবর নেন ড. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধ প্রবনতা বেড়েই চলেছে। পুলিশ এই দুইজনকে গুলি করার বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক।’
এ ব্যাপারে এসআই শোয়েব আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নান্নু যশোরের মনিহার এলাকার একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী। হত্যা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে যশোর সদর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। নান্নু পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে আহত হওয়ার পর এলাকার সাধারণ মানুষ মিছিল করেছে। তার ভয়ে এলাকাবাসী মুখ খোলার সাহস পেতো না। বিকিকে গুলি করার অভিযোগের ব্যাপারে এসআই শোয়েব বলেন, বিকি একজন উড়ন্ত ছিনতাইকারী। গভীর রাতে বিকি যশোর-বেনাপোল সড়কে ছিনতাই এমনকি বাস ডাকাতিও করে। কয়েকদিন আগে বিকি স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা মিথুনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার চেষ্টা করে। ঐ ঘটনায় মিথুন বিকির বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা করেছেন। এছাড়া বিকির বিরুদ্ধে ২ টি হত্যা মামলা ও ৫ টি ছিনতাই মামলা রয়েছে।
এ ব্যাপারে যশোর পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, নান্নু এলাকার চি?িহ্নত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে ৭ টি মামলা রয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে নান্নু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বিকিও এলাকার চি?িহ্নত সন্ত্রাসী। ছাত্রলীগ নেতা মিথুনকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করেছে। তার বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে।
