খোশ আমদেদ মাহে রমজান

আপডেট : ২৬ জুন ২০১৪, ২০:২৮
ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে রমজান হচ্ছে অন্যতম একটি। রমজান হচ্ছে সিয়াম সাধনা। যদিও কেউ কেউ কৃচ্ছ সাধনা ও উপবাস প্রভৃতি শব্দদ্বারা সিয়ামের ভাব প্রকাশ করে থাকে। সিয়াম শব্দটিকে ফার্সি ভাষাতে রোজা বলা হয়। আরবি সিয়াম শব্দের শাব্দিক অর্থ বিরত হওয়া এবং শরীয়তের পরিভাষায় সিয়াম হল কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে বিশেষ বিষয় হতে নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষভাবে বিরত থাকা। রোজা সম্পর্কে মহান আল্লাহতালা ঘোষণা করেছেন “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল।” রোজা মহান আল্লাহতালার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম। সৃষ্টির সূচনা পর্বের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে। হযরত আদম (আ.) এর সময় থেকে এর সূচনা। হযরত আদম (আ.) এর পরবর্তী নবীগনের মধ্যে অন্যতম এবং প্রথম রাসূল হচ্ছেন হযরত নূহ (আ.)। হযরত নূহ (আ.) এর যুগ থেকেই প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোজা রাখার বিধান ছিল। আর তা বহাল ছিল শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর যুগ পর্যন্ত। অত:পর যখন রমজানের রোজা পালনের বিধান আরোপ করা হল তখন হতে প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা রাখার বিধান রহিত হয়ে গেল। রোজা ইসলামের মূলভিত্তি বা আরকানের অন্যতম। রোজার অপরিসীম ফজিলত রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, “লোকজন যদি জানত রমজান কত বড় নেয়ামত তবে তারা সারা বছর ধরে রোজা রাখার ইচ্ছে প্রকাশ করত।” রমজানের রোজা ও প্রতিমাসের তিনটি রোজা অন্তরের ময়লা দূর করে দেয়। নবী করিম (স.) তাঁর উম্মতদের উদ্দেশ্যে উপদেশ হিসেবে বলেছেন- “তোমাদের মাথার ওপর এমন একটি মর্যাদাশীল মোবারকময় মাস ছায়া স্বরূপ আসছে যার মধ্যে শবে ক্বদর নামে একটি রাত্রি আছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। মহান আল্লাহ তায়ালা সেই রাত্রিতে জেগে থাকা অর্থাত্ তারাবীহ পড়াকে তোমাদের জন্য পূণ্যের কাজ হিসেবে নিধারণ করেছেন। যে ব্যাক্তি এ মাসে কোন একটি নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। নবী করিম (স.) আরো বলেন, “এটা ছবরের মাস এবং ছবরের পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালা রোজাদারদের জন্য বেহেশত নির্ধারণ করে রেখেছেন।” রমজান মাস হচ্ছে মানুষের সাথে সহানুভূতি প্রকাশ করার মাস। পবিত্র রমজান মাস আরবী বছরের নবম মাস। ফজিলত এবং মর্যাদার দিক দিয়ে পবিত্র রমজান মাস বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসটিতে মহান আল্লাহতায়ালা খাস এবং সর্বাধিক ফজিলত দান করেছেন। এমাসের যেকোন নেক বা পূন্যের কাজ দ্বারা অন্য যেকোন মাসের নেক কাজের সত্তর গুণ বেশী সওয়াব পাওয়া যায়। পবিত্র রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে পবিত্র কোরআন এবং হাদীসে অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। রমজান মাস সে মাস যে মাসে পবিত্র কোরআন নাযিল হয়েছে। যা মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক ও যাতে রয়েছে হেদায়েতের নিদর্শন সমূহ। যা নাকি হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে। এ মাস শুধু পবিত্র কুরআন নাযিলের মাসই নয় বরং এ মাসে মহান আল্লাহতায়ালা আখেরী নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) এর উম্মতগণের জন্য একমাস রোজা ফরয করেছেন। রমজান মাসে পূর্ণ রোজাদারদের মোট আটটি ফরজ পূর্ণ হয়ে যায়। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে যাকাতের পরই রোজার স্থান গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত ইবাদতের মধ্যে রোজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রোজা দ্বারা দুঃখী ও নির্মম মানুষের ক্ষুধার কষ্ট অনুভবের সুযোগ হয় এবং তা দ্বারা গরীবদের প্রতি করুণা এবং দয়া মমতা সৃষ্টি হয়ে দানশীলতা এবং পরোপকার করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তা ছাড়া রোজা দ্বারা মানুষের সংযম, ধৈর্য, গুণ এবং স্বাস্থ্যগত উপকার সাধিত হয়। রোজা দ্বারা মানুষ কর্মঠ, সহিষ্ণু, সহনশীল, নিয়মানুবর্তিতা এবং পরিশ্রমী হতে সুযোগ লাভ করে। নবী করিম (স.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান গ্রহণ করার পর নামাজ আদায় করে, যাকাত দেয়, হজ্ব পালন করে কিন্তু রোজা রাখেনা তাহলে এসব ইবাদত তার মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। যেহেতু রোজা একটি ফরজ ইবাদত, আর প্রত্যেক ফরজ ইবাদতের এই হুকুম পালন না করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। রমজান সবর এবং ধৈর্য্যের মাস। এই ধৈর্য্যের প্রতিদান হলো বেহেশত। এ মাসে মুমিনের রিযিক বৃদ্ধি করা হয়। যে ব্যক্তি রোজাদারদের ইফতার করাবে তার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। এতে রোজাদার ব্যক্তির সওয়াবের কোন কমতি হয় না। এই পবিত্র রমজান মাসে চারটি কাজ অবশ্যই করণীয়। দুটি কাজ এমন যে, তা দ্বারা মহান আল্লাহতায়ালা সন্তুষ্ট হন। আর অবশিষ্ট দুটি এমন যা ব্যতিত গত্যন্তর নেই। এই চারটির মধ্যে একটি হচ্ছে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করা। আর দ্বিতীয়টি হলো ইস্তেগাফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। তৃতীয় এবং চতুর্থ কাজ হলো জান্নাতের আশা করা এবং দোজখ থেকে পরিত্রাণের প্রার্থনা করা। এসব কাজ করা সবার জন্য একান্ত জরুরী। মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করছেন যে, “রোজা আমার জন্য এবং আমি এর প্রতিদান স্বয়ং নিজেই দিব।” রোজা হল মানুষের জন্য ঢাল স্বরূপ। মানুষ যেমন ঢাল দ্বারা আত্মরক্ষা করে, সেরূপ রোজা দ্বারা শয়তানের আক্রমণ থেকে ঈমান এবং আমল বাঁচানো যায়। সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, কামাচার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা হলো প্রকৃত রোজা।