বাংলাদেশের সঙ্গে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা অভিন্ন তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করছে ভারত। পাশাপাশি স্থল সীমান্ত চুক্তির (এলবিএ) প্রটোকলগুলো ভারতীয় রাজ্যসভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ঢাকা সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় একথা জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল সকালে এক ঘণ্টা ধরে চলে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এতে ঝুলে থাকা ও দ্বিপাক্ষিক সব ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত করে কিভাবে উন্নয়ন কেন্দ্রিক পর্যায়ে উত্তীর্ণ করা যায় সে ব্যাপারে দুই পক্ষ আলোচনা করেন। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেন। পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দীন বিকালে পৃথক প্রেস ব্রিফিং দেন।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ঝুলে থাকা তিস্তা ও এলবিএ প্রটোকল ছাড়াও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা, বিদ্যুত্, বাণিজ্য ও উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, জনসংযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন। সার্ক, বিমসটেক, বিসিআইএম, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশ একযোগে কাজ করবে। সুষমা স্বরাজ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালন করায় বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করেন ও ধন্যবাদ জানান। তিনি ঢাকা ও নয়াদিল্লীর সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ভিসা ইস্যুতে ১৩ বছরের কম ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশিদের মাল্টিপল ভ্রমণ ভিসা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। আগরতলায় বাংলাদেশ ভিসা অফিসকে সহকারি হাইকমিশনে উন্নীতকরণ, ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেসের সংখ্যা ও যাত্রী বৃদ্ধি, ঢাকা-গৌহাটি বাস পরীক্ষামূলকভাবে চালু, ত্রিপুরার পালাটানা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি, শান্তি নিকেতনে বাংলাদেশ ভবন স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে দুপক্ষ সম্মত হয়। দু’দেশের মধ্যকার যৌথ পরামর্শক কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক জুলাই মাসে নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত হবে। এতে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বৈঠক করবেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণপত্রের কথা জানান। আমন্ত্রণপত্রে নরেন্দ্র মোদী দ্বিপাক্ষিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে ঘন ঘন সাক্ষাতের ইচ্ছা পোষণ করে বলেন, আমাদের জন্য বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশী নয়, বরং অভিন্ন সংস্কৃতি, সভ্যতা, ইতিহাস ও জনগণের সংযোগের একটি জাতি। একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে বাংলাদেশের জন্য আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ এবং গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বহুমত ও আইনের শাসনের ধারক। নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান ও আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে স্বল্প সময়ের জন্য ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী প্রেস ব্রিফিং-এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সৌহার্দ্যমূলক বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্নের জবাবে জানান, বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেনি। ত্রিপুরায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে দশ হাজার টন চাল ছোট ছোট ট্রাক দিয়ে পরিবহনের জন্য ভারতকে সুযোগ দেয়া হবে। নারায়ণগঞ্জে বহুল আলোচিত সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি কলকাতায় আটক নূর হোসেনকে ফেরত দেবে ভারত। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এজন্য অনুরোধ করবে। একইভাবে উলফা নেতা অনুপচেটিয়াকে হস্তান্তরের বিষয়টি দেখবে বাংলাদেশ।
মাহমুদ আলী বলেন, ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সবগুলো ইস্যুর নিষ্পত্তি করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এজন্য সম্ভব সব কিছু করা হবে। বাংলাদেশও বরাবরের মতো সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন প্রেস ব্রিফিং-এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠককে ফলপ্রসূ, সফল, গঠনমূলক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ১৬ বছর পর বাংলাদেশে এলেন।
এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাপক উন্নতি করেছে। বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে এদেশে এলেন। ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো গতি দিতে প্রস্তুত আছে। পাশাপাশি নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করে যাবে। দু’দেশের রক্ত একই স্থান থেকে উত্থিত। ভাগ্যও অভিন্ন। সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় কাজ করছে। দুই দেশ একে অপরের ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে কোনো বিষয়ে ভারতের গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা যেকোনো ইস্যুতে ভারত জড়ায় না। এক দেশ অপর দেশের সঙ্গে কাজ করে। সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হয় না ভারত।
নূর হোসেনকে ফেরত দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো দেশের অপরাধীদের স্থান নেই ভারতে। ভারত সন্ত্রাসীদের জন্য কোনো নিরাপদ স্থান হতে পারে না। কোনো দেশ চাইলে অবশ্যই ভারত অপরাধীদের ফিরিয়ে দিতে পিছপা হবে না।
দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষে অন্যদের মধ্যে ভারতে নিযুক্ত হাইকমিশনার তারিক এ করিম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং, বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী গতকাল সুষমা স্বরাজের সম্মানে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নৈশভোজের আয়োজন করেন।
আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে এগারটায় সুষমা স্বরাজ সফর শেষে নয়াদিল্লী ফিরে যাবেন। সকালে সোনারগাঁও হোটেলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সাক্ষাত্ করবেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা মশিউর রহমন ও গওহর রিজভীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করবেন। সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গেও তার সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে।
