জাপানী সহায়তা ও পরবর্তী করণীয়

আপডেট : ২৭ জুন ২০১৪, ১৯:০৮
সারণী:১৯৭২-২০১৩ পর্যন্ত জাপানের সাহায্য প্রতিশ্রুতি (মিলিয়ন ডলারে) সহায়তার ধরন অনুদান ঋণ মোট খাদ্য সহায়তা ২৪৬ ১৬৩ ৪০৯ পণ্য সহায়তা ২,২৬৮ ১,৩২৩ ৩,৫৯১ প্রকল্প সহায়তা ৯২৭ ৬,২৯৭ ৭,২২৪ সর্বমোট ৩,৪৪১ ৭,৭৮৩ ১১,২২৪ সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। অপরদিকে সবুজে ভরা বাংলাদেশ। দেশ দুটির মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে, যখন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাটি স্থায়ী রূপ পায়। জাপানের সাদা জমিনের মাঝে লাল সূর্যের পতাকা আর বাংলাদেশের সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মধ্যে মিশে আছে গৌরব। বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। যা লাল সূর্যের মধ্যে মিশে আছে। আর জাপানীরা শত শত বছর ধরে এই লাল সূর্যকে গৌরব ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছে। রাজকীয় প্রথার নিদর্শনও আছে এই লাল সূর্যে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ষাটের দশকেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দেশটির পতাকা কী হবে, জাতীয় সঙ্গীত কী হবে এসব নিয়েও তিনি তখন চিন্তা-ভাবনা করতেন। তাঁর ভাবনায় ছিল জাপানের পতাকা। জাপান কঠিন আর্থ-সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ থেকে আজকের উন্নত বিশ্বের মর্যাদা লাভ করেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি আজ উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে সমাজ ব্যবস্থায়ও। বাংলাদেশও তাই। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে টেনে তোলার ব্রত নিয়ে কাজ শুরু করেন ১৯৭২ সালে। এগিয়ে যেতে শুরু করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ। পঁচাত্তরের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্যে দিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও উন্নয়ন থেমে থাকেনি। তবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ৪৩ বছরেও বাংলাদেশ জাপানের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক খাতে চমত্কার অগ্রগতি সাধন করেছে। বিগত পাঁচ বছরে অর্থনীতিতে গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মুডি’স এবং স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর’স বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান গত পাঁচ বছর ধরে অপরিবর্তিত রেখেছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্যের এটি একটি বড় স্বীকৃতি। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে সরকার ২০১০-২০২১ মেয়াদি একটি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ১৮০ ডলারে উন্নীত হয়েছে যা ২০০৮ সালে ছিল মাত্র ৬৩০ ডলার। দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ৪০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। রপ্তানি আয় ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে জাপানের বন্ধুত্বের গোড়াপত্তন হয় ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাপান সরকার ও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের মধ্য দিয়ে। তখন জাপানের স্কুল শিক্ষার্থীরা তাদের টিফিনের অর্থ বাংলাদেশের আর্ত-পীড়িতদের সাহায্যে দান করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দুই মাসের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে জাপান অংশ নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু জাপান সফর করেন ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গভীর হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে সেই বছরই জাইকা যমুনা নদীর ওপর ব্রীজ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে। ১৯৯৮ এই বঙ্গবন্ধু ব্রীজ উদ্বোধন করা হয়। ১৯৭৫ সালে জাপানের বর্তমান সম্রাট আকিহিতো তখন যুবরাজ হিসেবে তাঁর পত্নীসহ বাংলাদেশ সফর করেন। এভাবেই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়। জাপানের অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের উন্নয়নে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা বাড়তে থাকে। ১৯৭২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশকে ১১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার অনুদান ও ঋণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয় (সারণী-১)। এ পর্যন্ত ৭ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। এ সহায়তার মাধ্যমে জাপান বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ উন্নয়ন অংশীদারে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনের সময় যে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে সেই তো প্রকৃত ও পরীক্ষিত বন্ধু। কোনো কোনো সরকারের সময় জাপানের সাহায্য-সহযোগিতার প্রবাহ মন্থর হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাপান ১৯৯৭ সালে পদ্মা সেতু এবং খুলনায় রূপসা সেতু নির্মাণের জন্য সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা রূপসা সেতু নির্মাণ করে। পদ্মা সেতু নির্মাণের সমীক্ষাও করে। সেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এখন শুরু হয়েছে। এমনি প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মে মাসের শেষ সপ্তাহে জাপান সফর করেন। এর মধ্য দিয়ে সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শীর্ষ বৈঠক শেষে ২১-দফা যৌথ ইশতেহারে বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপাক্ষিক সমন্বিত অংশীদারিত্ব সম্পর্কের সূচনা হয়েছে। এ অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় জাপানের অংশগ্রহণকে আরও বেগবান করবে; যার সুফল দেশের জনগণ দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবে। যৌথ ইশতেহার অনুযায়ী জাপান বাংলাদেশকে ৬ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে। এটি হচ্ছে, জাপান ওডিএ ঋণের আওতায় বাংলাদেশকে নিয়মিত অর্থ সাহায্যের অতিরিক্ত। যৌথ ইশতেহারে ওডিএ’র আওতায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এই ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা আগামী ৪-৫ বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। এ লক্ষ্যে অতিশীঘ্র একটি জাপানী অর্থনৈতিক সমীক্ষা দল বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বাংলাদেশের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নির্ধারণ ও প্রণয়নে সমীক্ষা চালাবেন। সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে অপর একটি রেল সেতু নির্মাণ, যমুনা নদীর নিচ দিয়ে জামালপুর-গাইবান্ধা সংযোগকারী একটি বহুমুখী টানেল নির্মাণ, ঢাকা ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ এবং ঢাকার চারপাশের চারটি নদী দূষণ মুক্ত করা। নিয়মিত ওডিএ ঋণ প্যাকেজের আওতায় কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে ১৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপিত হবে। এছাড়া অংশগ্রহণমূলক সিটি প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন, হাওর বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাপন উন্নয়ন, প্রাকৃতিক গ্যাস দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য উত্পাদনশীলতা উন্নয়ন ও বহুমুখীকরণে অর্থায়ন করা হবে। জাপান বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তার পরিমাণ বাড়ালেও বাংলাদেশ-জাপান বাণিজ্য সম্পর্ক বিশেষ করে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ খুব কম ছিল। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ২০৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। সেই বছর জাপান থেকে আমদানি হয়েছিল ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিগত পাঁচ বছরে জাপান থেকে আমদানি প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার বাড়লেও রপ্তানি প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে এক বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিগত সরকার জাপানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বেশকিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ আদায় করেছে। এবারের সফরে দেশের নীট পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিন আরো শিথিল করার বিষয়ে জাপান আশ্বাস দিয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও বাড়াতে কাজ করতে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশে একটি পিসবিল্ডিং সেন্টার স্থাপনে জাপান কারিগরি সহায়তা দেবে। জাপানী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের আরও বেশি বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে প্রায় ২০০ জাপানী কোম্পানি বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সাথে যুক্ত আছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার জাপানী বিনিয়োগ হয়েছে। বাংলাদেশ জাপানী বিনিয়োগকারীদের জন্য ইপিজেডে ৪০টি প্লট এবং ২টি শিল্প ইমারত সংরক্ষিত থাকবে বলে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে জাপানী সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়। জাপানে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যেও সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এসব অনুরোধ জাপান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে। জাপানের এই প্রতিশ্রুত অর্থ ও কারিগরি সহায়তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ যাতে সময়মতো সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প স্থান নির্ধারণে দোদুল্যমানতা পরিহার করতে হবে। একইসাথে প্রকল্পের প্রোফাইল তৈরি, টেন্ডারের কাগজ তৈরি ও আনুষঙ্গিক কাজকর্ম শেষ করতে হবে। তারপর আছে দীর্ঘ প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া। একাজে অনেক সময় অপচয় হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ উন্নয়ন অংশীদাররা প্রায়ই করে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তারপর আসবে বাস্তবায়ন পর্যায় যা সাধারণত ভূমি অধিগ্রহণ দিয়ে শুরু হয়। বাস্তবায়নেও অধিকাংশ সময় ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘসূত্রতা হয়। বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে গতানুগতিক ধারা প্রচলিত আছে সেই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আগামী ৪-৫ বছরে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন হবে না। এজন্য প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামর্থ্য ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। নতুন প্রেরণা নিয়ে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি স্তরে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকলকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভাল কাজের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার দেয়ার প্রথা চালু করতে হবে। তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও টীম চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে। সততা ও নিষ্ঠার সাথে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। কাজের মানও ভাল হবে। জাপানী সহায়তা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবে রূপ দেয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার পথও সুগম হবে।