জীবনানন্দের দর্পণ ‘জীবনানন্দ’

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:২৪

এক অস্থির সময়ে আমাদের সামনে এল ‘জীবনানন্দ’র প্রথম সংখ্যা। যেন অদ্ভুত আঁধারে এক ঝলক আলো। চরম বাস্তবতার মধ্যে একজন রোমান্টিক শিল্পীকে প্রিজমের ভেতর দিয়ে দেখার প্রয়াস এই পত্রিকা। আরো একবার স্পষ্ট হলো, কবি জীবনানন্দ দাশ আজও কতটা প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক। এটি ‘জীবনানন্দ-চর্চার পত্রিকা’। তাঁকে নিয়ে এত্ত লেখাজোখা, অসংখ্য গবেষণা, কত অনুবাদ—তারপরও কেন এই ‘জীবনানন্দ’? সম্পাদক মাসউদ আহমাদ বলছেন—‘আমাদের সমসাময়িক জীবনভাবনার অনন্য রূপকার জীবনানন্দ দাশ।...আমরা, বাজার থেকে একটু সুগন্ধী কিনে তার সৌরভ জনতার মাঝে বিলাতে চাইনি, বরং নতুন একটি সুগন্ধী-প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অভিপ্রায়ে এই স্বপ্ন-পরিকল্পনায় অগ্রসর হয়েছি। সেই স্বপ্নের নাম ‘জীবনানন্দ’।’ প্রথম সংখ্যাতেই কথা রাখতে পেরেছেন তিনি। এর এক-একটি লেখা এক-একটি আয়নার মতো, এক-এক আয়নায় কবির এক-এক রূপ প্রতিবিম্বিত হয়েছে। কী নেই এই সংখ্যায়! তিন জন জীবনানন্দ-গবেষকের সাক্ষাত্কার—ভূমেন্দ্র গুহর সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সাংবাদিক-লেখক আনিসুল হক ও কবি জাফর আহমদ রাশেদ; ‘একজন কমলালেবু’র ঔপন্যাসিক শাহাদুজ্জামানের সাক্ষাত্কার নিয়েছেন সম্পাদক মাসউদ আহমাদ এবং ক্লিনটন বি সিলির সাক্ষাত্কার নিয়েছেন নাসির আলী মামুন; আছে নবীন-প্রবীণ লেখকদের জীবনানন্দ-ভাবনা, জীবনানন্দ-কেন্দ্রিক ছোটগল্প, তাঁকে নিবেদিত একগুচ্ছ কবিতা...। রচনা ধরে ধরে আলোচনা এই অল্প পরিসরে সম্ভব নয়। কবিতাই আছে ২৪টি! গল্প ৭টি, গদ্য ১৩টি; আছে একটি দীর্ঘ কাব্যগল্প, শিরোনামটি তো অসামান্য—‘ও জানেমন জীবনানন্দ, বনলতা সেন লিখছি’; এর প্রথম ক’ লাইন এমন : ‘হাই জিবস, হ্যান্ডসাম, জান ও জেগর/পাখির নীড়ের মতো চোখ পেতে বসে আছি আজও/তুমি উড়ে অকস্মাত্ কোথায় পালাবে?/এখনও কি ধানসিঁড়ি নদীপাড়ে ভেরাণ্ডাই ভাজো!’

শিশির রায়ের লেখাটি অনবদ্য। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রামের তলায় পড়ে গুরুতর আহত হন জীবনানন্দ, মারা যান ২২ অক্টোবর। সেই সময়ের কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা এবং অন্যান্য সূত্র কী বলছে কবির মৃত্যু বিষয়ে? পূর্বাপর তথ্য-উপাত্ত এবং প্রমাণপঞ্জি সংগ্রহ করে দারুণ একটি লেখা লিখেছেন তিনি। পড়ে প্রীত হয়েছি।

জীবনানন্দের আলো নিয়েই শুধু কথা হয়নি, তাঁর অন্ধকারও এসেছে (রাসেল রায়হানের অন্য ধরনের লেখা—মুগ্ধতার বাইরে ‘সমারূঢ়’র প্রতিক্রিয়া)। অনেকে একেবারে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে কবিকে দেখেছেন। সবশেষে আছে বইয়ের গল্প; লিখেছেন এ সময়ের গুণী লেখক হরিশংকর জলদাস—যেভাবে লেখা হলো ‘জীবনানন্দ ও তাঁর কাল’। গল্পের ঢঙে লেখা এই রচনাটি সুপাঠ্য এবং কৌতূহল জাগানিয়া।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাত্র ৯৯ টাকায় ২৫৬ পৃষ্ঠার একটি আকর-পত্রিকা পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারাটাও অনেক বড় ব্যাপার। ঝকঝকে ও জঞ্জালমুক্ত বিমূর্ত প্রচ্ছদ দেখেই সাহিত্যপ্রেমীদের ভালো লেগে যাবে। পত্রিকার গেটআপ ও মেকাপ সুন্দর, সুরুচির ছাপ পাওয়া যায়। ‘জীবনানন্দ’ পত্রিকাটি জীবনানন্দ দাশকে বারবার নতুনভাবে আবিষ্কার করুক, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে চলুক নানা রঙ ও রেখায়—সেই প্রত্যাশা তো থাকবেই।

জীবনানন্দ

সম্পাদক : মাসউদ আহমাদ

১ম সংখ্যা অক্টোবর ২০১৮

পৃষ্ঠা : ২৫৬, দাম : ৯৯ টাকা

যোগাযোগ : ৫০ আজিজ সুপার মার্কেট

শাহবাগ, ঢাকা ১০০০