ইংরেজি নাম :Spanish cherry, Medlar, and Bullet wood
সংস্কৃত নাম: আনাঙ্গাকা, বকুলা, বকুলাহ, ছিড়াপুস্প, কেশারা, মধুপাঞ্জারা, মধুছন্দা, মধুপুস্প প্রভৃতি
বাংলা নাম :বকুল, বহুল, বুকাল, বাকুল, বাকাল।
বৈজ্ঞানিক নাম :Mimusops elengi L.
‘ঝরকে ঝরকে ঝরিছে বকুল
আঁচল আকাশে হতেছে আকুল’ (রবীন্দ্রনাথ)
পরিচিতি
সুগন্ধযুক্ত ফুলের জন্য ছায়াতরু ও সুদর্শন প্রকৃতির বকুল সকলের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত বৃক্ষ। এ গাছ সর্বদা সবুজ পাতায় আবৃত থাকে। এ বৃক্ষের মাথা কখনো কখনো গোলগাল কিংবা লম্বাটে। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় এর গাছ পাওয়া যায়। শিক্ষাঙ্গন, মন্দির, রাস্তাপার্শ্ব, উদ্যান, বাড়ীতে বকুল গাছ লাগানো হয়। এই গাছ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী এলাকায় বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, বার্মা, ইন্দো-চীন, থাইল্যান্ড, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এলাকায় দেখতে পাওয়া যায়। তবে, মালয়েশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, নিউ ক্যালিডোনিয়া (ফ্রান্স), ভানুয়াটু এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়াতে এই গাছ চাষ করা হয়।
বকুলের বর্ণনা
বকুল মাঝারী আকারের চিরহরিত্, ছায়াঘন এবং সুষম আকৃতির বৃক্ষ। বয়স্ক বৃক্ষ ১২ থেকে ১৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কান্ড সরল, নাতিদীর্ঘ ও বহু শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট। বকুল গাছের ছাল মোটা, গাঢ় কালচে বাদামী কিংবা কালচে ছাই রঙের এবং অমসৃণ হয়ে থাকে। এই বৃক্ষের পাতা কালচে সবুজ, মসৃণ, ঢেউ খেলানো ও ঘন বিন্যস্ত। এ বৃক্ষেও কচি পাতার বর্ণ হালকা সবুজ, তৈলাক্ত ও হালকা উজ্জ্বল। বকুলের পত্র বিন্যাস একান্তর অর্থাত্ একটির পর একটি পাতা সাজানো। পাতার আকারে ৫ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া হয়।
বকুল ফুল
আকারে বকুলের ফুলগুলো খুব ছোট, ১ সেন্টিমিটারের মত। দেখতে ছোট ছোট তারার মতো। ফুলের রং হলুদাভ সাদা বা ক্রিম রঙের হয়। ফুল রাত্রে ফোটে এবং সারাদিন ধরে টুপটাপ ঝড়তে থাকে। ঝড়েপরা বকুলের দৃশ্য নয়নাভিরাম। ফুল সমৃদ্ধ গাছের প্রকৃতি অন্যরকম। বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ফুল শুকিয়ে বিবর্ণ হলেও ফুলের সুগন্ধ অনেক দিন পর্যন্ত থাকে। ফুলে থাকে উদ্বায়ী তেল। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে মনমাতানো ঝড়া বকুলের গন্ধে সকল শ্রেণির মানুষ আকৃষ্ট হয়। শিশুরা ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথে, প্রিয়জনদের উপহার দেয়। তরুণ-তরুণী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা হাতে ও গলায় বকুলের মালা পরে। গৃহাঙ্গন ভরে যায় বকুলের গন্ধে।
ফল
কুলের মতো ডিম্বাকৃতির, পাকা ফলের রং হলুদ, শাঁস নরম এবং একমাত্র বীজটি খুব শক্ত। কখনও কখনও দুটি বীজও থাকতে দেখা যায। ফলের স্বাদ কষযুক্ত ও হালকা মিষ্টি। ফলগুলো কাঁচা অবস্থায় সবুজ হয়। পাখিরা এ ফল খেতে খুব ভালোবাসে। অনেক সময় বাচ্চাদের ও বকুল ফল খেতে দেখা যায়। গাছে এই ফল আসে বর্ষাকালে। তবে এই বীজ থেকে অনুদ্বায়ী তেল পাওযা যায়।
বকুলের ব্যবহার
ভারতে বকুল ফুলের নির্যাস সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীরা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে বকুল ফুলের মালা চুলে বা গলায় পরে। মালয়’রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে। অনেক এলাকায় বকুল গাছের কাণ্ড বা নরম ডাল দাঁত মাজার জন্য ব্যবহার করে থাকে।
বকুল কাঠ অনেক দামি আর দুষ্প্রাপ্য কাঠ। এর কাঠ অনেক শক্ত, কঠিন প্রকৃতির, খুব সহজে কাটা যায় না। এ বৃক্ষের কাঠ থেকে বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র তৈরি হয় । এ বৃক্ষের কাঠের রঙ গাঢ় লাল। এই কাঠ ঘর-বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। ।
বকুলের ঔষধি গুণাগুণ
বকুলের ছাল, পাতা, ফুল ফল, ডাল ও পাতার নির্যাস আয়ুর্বেদিক বিভিন্ন ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে শ্বেতীরোগ, দাঁতের ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা, শিশুদের কোষ্ঠবদ্ধতা, পুরাতন আমাশা শুক্র তারল্য ইত্যাদি রোগে নিরাময়ে এ সকল ওষুধ তৈরি করা হয়। পাকা ফল খাওয়া যায়। মালয়’রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে। এ ছাড়াও বকুল ফুল দিয়ে সিরাপ তৈরি করা হয়।
